Play Tube video
দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ কী? যে ভুলগুলো আপনার দোয়া কবুলের পথে বাধা!
দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ
দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ কী, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? আমরা অনেক সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করি, কিন্তু সেই দোয়ায় কতটুকু আন্তরিকতা, বিনয় ও অন্তরের আকুতি থাকে? দোয়া শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এটি অসহায় বান্দার হৃদয় থেকে মহান রবের কাছে সাহায্য চাওয়ার এক পবিত্র মাধ্যম।
কেন আপনার দোয়া কবুল হয় না? জেনে নিন ৬টি কারণ
১. দোয়ায় মন নেই: মুখে দোয়া করছেন, অথচ অন্তরে কোনো অনুভূতি, আকুতি কিংবা মনোযোগ নেই।
২. আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস নেই: দোয়া করছেন, কিন্তু মনে সংশয় রাখছেন—আল্লাহ কি আমার দোয়া কবুল করবেন?
৩. বিনয় ও আন্তরিকতার অভাব: আল্লাহর কাছে নিজেকে অসহায় বান্দা হিসেবে সমর্পণ না করে শুধু মুখে চেয়ে যাচ্ছেন।
৪. হারাম উপার্জন ও পাপাচারে লিপ্ত থাকা: হারাম খাদ্য, অবৈধ উপার্জন ও অন্যায় কাজে জড়িয়ে থাকা দোয়া কবুলের পথে বাধা হতে পারে।
৫. দোয়ায় তাড়াহুড়া ও অধৈর্য হওয়া: কয়েকবার দোয়া করেই বলছেন, “এত দোয়া করি, তবুও আল্লাহ কবুল করেন না!”
৬. দোয়ার আদবের প্রতি উদাসীনতা: আল্লাহর সুন্দর নাম ধরে না ডাকা, নবীজি (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠের মতো উত্তম আদবগুলো অবহেলা করা।

দোয়া কবুলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও আদব
1. অন্তর থেকে দোয়া করা: অনুভূতিহীনভাবে নয়, মনোযোগ, আন্তরিকতা ও অন্তরের আকুতি নিয়ে আল্লাহর কাছে চাইতে হবে।
2. দৃঢ় বিশ্বাস রাখা: পূর্ণ ইয়াকীন রাখতে হবে যে, আল্লাহ আমাদের দোয়া শোনেন এবং তাঁর হিকমত অনুযায়ী কবুল করেন।
3. বিনয় ও নম্রতার সঙ্গে চাওয়া: নিজেকে অসহায় বান্দা মনে করে আল্লাহর কাছে বিনয়ের সঙ্গে প্রার্থনা করতে হবে।
4. দুই হাত তুলে দোয়া করা: ভিক্ষুকের মতো হাতের তালু উপরের দিকে রেখে আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। এটি দোয়ার একটি সুন্দর আদব।
5. আল্লাহর সুন্দর নাম ধরে ডাকা: ইয়া আল্লাহ, ইয়া রহমান, ইয়া রহিম, ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাইয়্যুম—এভাবে আল্লাহর নাম ধরে দোয়া করতে হবে।
6. নবীজি (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠ করা: দোয়ার শুরুতে ও শেষে দরুদ পাঠ করা উত্তম আদব।
7. দোয়া কবুলের বিশেষ সময়গুলো কাজে লাগানো: ইফতারের সময়, বৃষ্টির সময় এবং আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে বেশি বেশি দোয়া করতে হবে।
8. মা-বাবার দোয়া নেওয়া: মা-বাবার দোয়ার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে দোয়া চাইতে হবে।

9. অন্যায় ও জুলুম থেকে বিরত থাকা: মজলুমের দোয়াকে ভয় করতে হবে। কারণ, মজলুমের দোয়ার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
10. সেজদায় বেশি বেশি দোয়া করা: সেজদা আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ মুহূর্ত। তাই সেজদায় অন্তর থেকে দোয়া করতে হবে।
11. হালাল উপার্জন ও পবিত্র জীবনযাপন করা: হারাম উপার্জন ও হারাম খাদ্য থেকে বিরত থাকতে হবে।
12. দোয়ায় অধৈর্য না হওয়া: দোয়া করার পর হতাশ না হয়ে আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রাখতে হবে।
মনে রাখবেন: দোয়া শুধু মুখের কিছু শব্দ নয়; দোয়া হলো বান্দার অন্তর থেকে তার রবের কাছে ফিরে যাওয়ার এক সুন্দর মাধ্যম।

এই বিষয়ে সরাসরি মিজানুর রহমান আজহারীর বক্তব্য উদ্ধৃত করা হলো।
রোবটিক দোয়া নয়। আপনি একটা সিস্টেম অন করে দিলেন, আর সেটা দোয়া করে যাচ্ছে। এর মধ্যে কোনো প্রাণ নেই, কোনো অনুভূতি নেই, কোনো উপলব্ধি নেই। এমন অনুভূতিহীন দোয়া আল্লাহ কবুল করেন না।
আপনার দোয়ায় প্রাণ থাকতে হবে। সেখানে আপনার ধ্যান থাকতে হবে, মন থাকতে হবে, অন্তরের আকুতি থাকতে হবে। আল্লাহর কাছে এমনভাবে চাইতে হবে, যেন আপনি সত্যিই তাঁর কাছে সবকিছু নিয়ে হাজির হয়েছেন।
কীভাবে যাবেন আল্লাহর কাছে?
বিনয়ের সঙ্গে যাবেন। আর ইয়াকীন রাখবেন, আমার দোয়া আল্লাহ অবশ্যই কবুল করবেন। এমন বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে চাইবেন। নিজেকে ছোট করে, অসহায় বান্দা হিসেবে তাঁর কাছে প্রার্থনা করবেন।
বিশেষ করে, দোয়ার সময় হাতের তালুগুলো উপরের দিকে রাখবেন। একজন ভিক্ষুক যেমন অসহায় হয়ে হাত পেতে বলে, “স্যার, দুই দিন ধরে কিছু খাইনি, স্যার! দুইটা টাকা দেন।”
ঠিক সেভাবেই হাতের তালুগুলো উপরের দিকে করে, ভিক্ষুকের মতো আল্লাহর কাছে চাইবেন।
হাত না তুলেও দোয়া করা যায়, আবার হাত তুলেও দোয়া করা যায়। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) হাত তুলে দোয়া করার কথা বলেছেন।
কারণ, “ইন্নাল্লাহা হাইয়্যুন কারিম।” অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি লজ্জাশীল ও মহান দাতা।
বান্দা যখন ভিক্ষুকের মতো দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে কিছু চায়, তখন সেই হাত খালি ফিরিয়ে দিতে আল্লাহ লজ্জাবোধ করেন। তাই হাত তুলে দোয়া করবেন।
দোয়ার মধ্যে আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম ধরে ডাকবেন।
“ইয়া আল্লাহ, ইয়া রহমান, ইয়া রহিম, ইয়া হাইয়্যু, ইয়া কাইয়্যুম, বিরাহমাতিকা আস্তাগিস।”
আল্লাহর নাম ধরে ধরে চাইবেন। অন্তর থেকে ডাকবেন। বিশ্বাস রাখবেন, আল্লাহ আপনার ডাক শুনছেন।
আর দোয়ার সময় অবশ্যই নবীজি (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়বেন।
যে দোয়ায় নবীর ওপর দরুদ পড়া হয় না, সেই দোয়া কবুলের ব্যাপারে বাধা থাকার কথা বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়, দরুদ না পড়া পর্যন্ত দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে আটকে থাকে।
মোবাইলে যেমন ব্যালেন্স না থাকলে মেসেজ পাঠালে তা পেন্ডিং থাকে, আবার টপআপ করলেই মেসেজ চলে যায়—বিষয়টি বোঝানোর জন্য এমন একটি উদাহরণ দেওয়া যায়।
তাই যদি বলেন, “হুজুর, আমার দোয়া কবুল হয় না!”
তাহলে ভেবে দেখুন, আপনি কি নবীজি (সা.)-এর ওপর দরুদ পড়েছেন?
“আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম ওয়া বারিক আলাইহি।”
দোয়ার শুরুতে দরুদ পড়বেন, মাঝেও পড়বেন, শেষেও পড়বেন। আগেও পড়বেন, পরেও পড়বেন। নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠের মাধ্যমে দোয়াকে সুন্দর করবেন।
কিছু বিশেষ সময়ে দোয়া কবুলের আশা আরও বেশি থাকে।
ইফতারের আগে দোয়া করবেন। বৃষ্টি যখন পড়ে, তখন দোয়া করবেন। আজান ও ইকামতের মাঝখানে দোয়া করবেন। মা-বাবার দোয়ার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। হজ থেকে কেউ ফিরে এলে তাঁর কাছেও দোয়া চাইবেন। খতমুল কুরআনের পরেও দোয়া করবেন।
আর মজলুমের দোয়া থেকে সাবধান থাকবেন। কারণ, মজলুমের দোয়া আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না।
আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে চাইলে সেজদায় লুটিয়ে পড়ুন।
তাহলে আল্লাহর কাছে যাওয়ার পথটি বুঝতে পারলেন তো?
আল্লাহর কাছে যেতে হলে বিনয়ের সঙ্গে সেজদায় লুটিয়ে পড়তে হবে।
আপনি যখন সেজদা করেন, তখন হয়তো মনে হয় আপনি কার্পেটের ওপর সেজদা দিয়েছেন। মনে হয় জায়নামাজের ওপর সেজদা দিয়েছেন। কিংবা মসজিদের টাইলসের ওপর কপাল রেখেছেন।
কিন্তু সেজদা কেবল মাটিতে কপাল রাখার নাম নয়। এটি আল্লাহর সামনে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করার এক গভীর মুহূর্ত। বান্দা তখন তার রবের বিশেষ নৈকট্য লাভ করে।
তাই দোয়া করুন প্রাণ দিয়ে, মন দিয়ে, চোখের পানি দিয়ে, বিনয় ও আকুতি দিয়ে। আল্লাহর কাছে চাইবেন পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে। কারণ, আপনার মনের অব্যক্ত কথাগুলোও আল্লাহ জানেন।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ দলিল
দোয়া কবুলের শর্ত ও আদব সম্পর্কে পবিত্র আল-কুরআন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা রয়েছে। নিচে নির্বাচিত ছয়টি রেফারেন্স সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ও সরাসরি ব্যাকলিংকসহ তুলে ধরা হলো।
পবিত্র আল-কুরআন থেকে রেফারেন্স
| বিষয় | আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা | সূত্র ও ব্যাকলিংক |
|---|---|---|
| ১. বিনয় ও আকুতি নিয়ে দোয়া করা | আল্লাহ বলেন, তোমরা তোমাদের রবকে কাকুতি-মিনতি করে ও গোপনে ডাকো। অর্থাৎ দোয়ায় আন্তরিকতা ও বিনয় থাকা উচিত। | Surah আল-আরাফ, verse ৫৫ |
| ২. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখা | আল্লাহ বলেন, আমি নিকটেই আছি। প্রার্থনাকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই। | Surah আল-বাকারা, verse ১৮৬ |
| ৩. আল্লাহর সুন্দর নাম ধরে ডাকা | আল্লাহর জন্য রয়েছে সুন্দরতম নামসমূহ। সুতরাং সেই নামগুলো ধরেই তাঁকে ডাকতে বলা হয়েছে। | Surah আল-আরাফ, verse ১৮০ |
কুরআনের তিনটি আয়াতই আপনার নির্ধারিত AlorDisha24-এর আল-কুরআন বিভাগ থেকে যাচাই করা হয়েছে।
সহিহ ও গ্রহণযোগ্য হাদিস থেকে রেফারেন্স
| বিষয় | হাদিসের শিক্ষা | সূত্র ও ব্যাকলিংক |
|---|---|---|
| ৪. হারাম উপার্জন দোয়া কবুলের বাধা | রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন ব্যক্তির কথা বলেছেন, যার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম। তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে—এ প্রশ্ন তুলে সতর্ক করেছেন। | সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০১৫ |
| ৫. দোয়ায় অধৈর্য না হওয়া | রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দার দোয়া কবুল হয়, যতক্ষণ সে তাড়াহুড়া করে না এবং বলে না যে দোয়া করেও সাড়া পেলাম না। | সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৪০ |
| ৬. দোয়ার আগে দরুদ পাঠ করা | রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়ার আগে আল্লাহর প্রশংসা এবং নবীজি (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠের শিক্ষা দিয়েছেন। | জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৪৭৭ — হাসান |
গুরুত্বপূর্ণ কথা
দোয়া কবুল হতে দেরি হলেই ধরে নেওয়া যাবে না যে আল্লাহ দোয়া প্রত্যাখ্যান করেছেন। আবার দরুদ না পড়লেই প্রত্যেক দোয়া আসমানে আটকে থাকে—এমন দাবিও নিশ্চিতভাবে করা উচিত নয়। দরুদ পাঠ দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ আদব।
মনে রাখবেন: আল্লাহ বলেন, “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” — Surah গাফির, verse ৬০।
মূসা (আ.) মহান আল্লাহকে দেখার বিস্ময়কর ঘটনা || মিজানুর রহমান আজহারী
