Play Tube video
জমজম কূপের অজানা তথ্য: জানুন ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
জমজম কূপের অজানা তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
জমজম কূপের অজানা তথ্য জানার মাধ্যমে আমরা হযরত হাজেরা (আ.)-এর ধৈর্য, হযরত ইসমাইল (আ.)-এর শৈশবের ঘটনা এবং আল্লাহর রহমতের কথা জানতে পারি। জমজম কূপের অজানা তথ্য ও ইতিহাস আমাদের আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দেয়।
জমজম কূপ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- 1. জমজম কূপের অজানা তথ্য
- 2. জমজম কূপের উৎপত্তির ইতিহাস
- 3. হযরত হাজেরা (আ.)-এর সাফা-মারওয়া দৌড়
- 4. হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সঙ্গে জমজমের ঘটনার সম্পর্ক
- 5. মক্কায় জনবসতি গড়ে ওঠার ইতিহাস
- 6. জমজমের পানি পান করার নিয়ম
- 7. কুরআন ও হাদিসের রেফারেন্স

মিজানুর রহমান আজহারীর ভিডিও দেখুন।
১. হযরত ইবরাহিম (আ.) যখন স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে জনমানবহীন মরুভূমিতে রেখে গেলেন
হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনে আল্লাহর ওপর ভরসা ও তাঁর নির্দেশ পালনের অসাধারণ দৃষ্টান্ত রয়েছে। আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাঁর স্ত্রী হযরত হাজেরা (আ.) এবং দুধের শিশু হযরত ইসমাইল (আ.)-কে মক্কার জনমানবহীন ও অনুর্বর উপত্যকায় রেখে আসেন।
সেই উপত্যকায় তখন কোনো জনবসতি ছিল না। খাবার ও পানির ব্যবস্থাও ছিল না। তাঁদের সঙ্গে ছিল সামান্য কিছু খেজুর ও পানি।
হযরত ইবরাহিম (আ.) যখন সেখান থেকে চলে যাচ্ছিলেন, তখন হযরত হাজেরা (আ.) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কেন তাঁদের এমন জনমানবহীন উপত্যকায় রেখে যাচ্ছেন। কিন্তু হযরত ইবরাহিম (আ.) কোনো উত্তর দিলেন না।
অবশেষে হযরত হাজেরা (আ.) জানতে চাইলেন, আল্লাহ কি তাঁকে এমনটি করার নির্দেশ দিয়েছেন? হযরত ইবরাহিম (আ.) জানালেন, হ্যাঁ।
তখন হযরত হাজেরা (আ.) বললেন, “তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না।”
সুবহানাল্লাহ! চারদিকে জনমানবহীন মরুভূমি, সঙ্গে দুধের শিশু, খাবার ও পানির সীমিত ব্যবস্থা—তারপরও আল্লাহর ওপর তাঁর ভরসা ছিল অটুট।
হযরত হাজেরা (আ.)-এর এই ঘটনা আমাদের শেখায়, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, আল্লাহর ওপর ভরসা হারানো উচিত নয়।
কুরআন ও হাদিসের রেফারেন্স:
- Surah ইবরাহিম, আয়াত ৩৭ — হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৬৪ — হযরত ইবরাহিম (আ.), হাজেরা (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর ঘটনা

২. হযরত হাজেরা (আ.)-এর সাফা-মারওয়ার দৌড়
হযরত ইবরাহিম (আ.) চলে যাওয়ার পর হযরত হাজেরা (আ.) তাঁর শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে নিয়ে সেখানে অবস্থান করতে লাগলেন। একসময় সঙ্গে আনা পানি শেষ হয়ে গেল। শিশুপুত্র তৃষ্ণায় কষ্ট পেতে লাগলেন।
সন্তানের এই অবস্থা দেখে মা হাজেরা (আ.) পানির সন্ধানে বের হলেন। তিনি সাফা পাহাড়ে উঠে চারদিকে তাকালেন, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না।
এরপর তিনি সাফা থেকে নেমে মারওয়া পাহাড়ের দিকে ছুটলেন। সেখানেও পানির সন্ধান পেলেন না। এভাবে তিনি সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাতবার যাতায়াত করলেন।
একজন মায়ের সন্তানের জন্য এই ব্যাকুল প্রচেষ্টা ছিল অসাধারণ। তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছিলেন, কিন্তু সেই ভরসার পাশাপাশি নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টাও করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সাফা ও মারওয়াকে তাঁর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আজও হজ ও উমরাহ পালনকারীরা এই দুই পাহাড়ের মধ্যে সাঈ করেন।
হযরত হাজেরা (আ.)-এর সেই প্রচেষ্টা মুসলিম উম্মাহর ইবাদতের সঙ্গে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
শিক্ষা: তাওয়াক্কুল মানে চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকা নয়। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
কুরআন ও হাদিসের রেফারেন্স:
- Surah আল-বাকারা, আয়াত ১৫৮ — সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শন
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৬৪ — হযরত হাজেরা (আ.)-এর সাফা-মারওয়ার মধ্যে যাতায়াত

৩. হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত জমজমের পানির অলৌকিক আবির্ভাব
হযরত হাজেরা (আ.) যখন সাফা ও মারওয়ার মধ্যে পানির সন্ধানে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন, তখন তাঁর শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.) তৃষ্ণায় কষ্ট পাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় আল্লাহর কুদরতে জমজমের পানির আবির্ভাব ঘটে।
প্রচলিত ইসলামি বর্ণনা ও ওয়াজে এই ঘটনাকে শিশু ইসমাইল (আ.)-এর পায়ের ধাক্কার সঙ্গে সম্পর্কিত করে বলা হয়। অর্থাৎ, শিশুর পায়ের কাছে আল্লাহর রহমতে পানি বেরিয়ে আসে—এভাবেই ঘটনাটি সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত।
তবে ধর্মীয় সূত্রের নির্ভুলতা বজায় রাখার জন্য একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। সহিহ বুখারির হাদিসে জমজমের পানির আবির্ভাবের বিবরণে ফেরেশতার কথা এসেছে। বর্ণনা অনুযায়ী, একজন ফেরেশতা তাঁর গোড়ালি অথবা ডানা দিয়ে মাটি খনন করেন। এরপর সেখান থেকে পানি বের হতে থাকে।
সুতরাং জমজমের পানির আবির্ভাব আল্লাহর কুদরতেই ঘটেছিল। ফেরেশতার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য আসার বিবরণ সহিহ বুখারিতে রয়েছে। আর ইসমাইল (আ.)-এর পায়ের ধাক্কার বিবরণটি প্রচলিত বক্তব্যে পাওয়া যায়; সেটিকে সহিহ বুখারির হুবহু বর্ণনা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
হযরত হাজেরা (আ.) পানি দেখে দ্রুত তা একত্র করতে লাগলেন। তিনি নিজের পানির মশক পূর্ণ করলেন, নিজে পানি পান করলেন এবং শিশুপুত্রকেও পান করালেন।
সহিহ বুখারির বর্ণনায় আরও এসেছে, হযরত হাজেরা (আ.) যদি জমজমের পানি সংগ্রহ করে আটকে রাখার চেষ্টা না করতেন, তাহলে তা প্রবাহিত ঝরনায় পরিণত হতো।
সুবহানাল্লাহ! যে উপত্যকায় কোনো পানির ব্যবস্থা ছিল না, সেখানে আল্লাহর রহমতে পানির ব্যবস্থা হলো। হযরত হাজেরা (আ.)-এর চেষ্টা ও তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি এটি ছিল আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। হাদিসের রেফারেন্স: সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৬৪ — জমজমের পানির আবির্ভাবের পূর্ণ বিবরণ

৪. জুরহুম গোত্রের আগমন, হযরত হাজেরা (আ.)-এর অনুমতি এবং মক্কায় বসতি স্থাপন
জমজমের পানি আবির্ভূত হওয়ার পর হযরত হাজেরা (আ.) ও তাঁর শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.) সেখানে বসবাস করতে থাকেন।
একসময় জুরহুম গোত্রের কিছু লোক ওই উপত্যকার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা একটি পাখিকে ওই স্থানের ওপর দিয়ে উড়তে দেখে বুঝতে পারে, সেখানে পানির কোনো উৎস থাকতে পারে। কারণ, তারা আগে ওই উপত্যকাকে পানিশূন্য বলেই জানত।
তারা লোক পাঠিয়ে খোঁজ নেয় এবং জমজমের পানির সন্ধান পায়। এরপর জুরহুম গোত্রের লোকেরা হযরত হাজেরা (আ.)-এর কাছে এসে সেখানে বসবাস করার অনুমতি চায়।
হযরত হাজেরা (আ.) তাঁদের বসবাসের অনুমতি দেন, তবে শর্ত রাখেন, পানির ওপর তাঁদের একচ্ছত্র অধিকার থাকবে না। তাঁরা এই শর্ত মেনে নেন।
এভাবে সেখানে মানুষের বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে। হযরত ইসমাইল (আ.) বড় হতে থাকেন এবং জুরহুম গোত্রের লোকদের কাছ থেকে আরবি ভাষা শেখেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ওই গোত্রেরই একজন নারীকে বিয়ে করেন।
এভাবে জমজমের পানিকে কেন্দ্র করে জনমানবহীন উপত্যকায় মানুষের বসতি গড়ে ওঠে। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া এবং আল্লাহর রহমতের সঙ্গে মক্কার ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িত।
আপনার দেওয়া বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন: জুরহুম গোত্রের লোকেরা হযরত হাজেরা (আ.)-এর কাছে বসবাসের অনুমতি চেয়েছিল এবং পানির ওপর একচ্ছত্র অধিকার না রাখার শর্ত মেনে নিয়েছিল। কিন্তু সহিহ বুখারির এই বর্ণনায় তারা ইসলাম গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল—এমন কথা উল্লেখ নেই। তাই এই দাবিকে হাদিসের নিশ্চিত বক্তব্য হিসেবে লেখা ঠিক হবে না।
হাদিসের রেফারেন্স:
– সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৬৪ — জুরহুম গোত্রের আগমন, অনুমতি ও বসতি স্থাপন
৫. হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া ও কাবাঘর নির্মাণ
হযরত ইবরাহিম (আ.) যখন হযরত হাজেরা (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-কে অনুর্বর উপত্যকায় রেখে যান, তখন তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, যেন মানুষের অন্তর তাঁর পরিবারের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তাঁদের ফলমূল দিয়ে রিজিক দান করা হয়।
পবিত্র কুরআনের সূরা ইবরাহিমের ৩৭ নম্বর আয়াতে এই দোয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.) কাবাঘরের ভিত্তি উঁচু করেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, তাঁরা উভয়ে কাবাঘরের ভিত্তি উঁচু করার সময় আল্লাহর কাছে তাঁদের কাজ কবুল করার দোয়া করেছিলেন।
এই ঘটনাগুলো মক্কার ইতিহাসে হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরে।
কুরআনের রেফারেন্স:
- Surah ইবরাহিম, আয়াত ৩৭ — হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া
- Surah আল-বাকারা, আয়াত ১২৭ — কাবাঘরের ভিত্তি উঁচু করার ঘটনা
৬. তায়েফের ঘটনা: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা
রাসুলুল্লাহ ﷺ মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করতে গিয়ে নানা বাধা ও কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন। তায়েফের ঘটনা তাঁর দাওয়াতি জীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায়।
সহিহ বুখারিতে হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, উহুদের দিনের চেয়েও কঠিন কোনো দিন তাঁর জীবনে এসেছিল কি না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর জাতির কাছ থেকে পাওয়া কষ্টের কথা জানান। বর্ণনায় ইবন আবদ ইয়ালাইলের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার কথা এসেছে। তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আহ্বানে সাড়া দেননি। এতে রাসুলুল্লাহ ﷺ অত্যন্ত মর্মাহত হন।
এরপর আল্লাহ তাআলা জিবরাইল (আ.)-কে পাঠান এবং পাহাড়ের ফেরেশতা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে উপস্থিত হন। পাহাড়ের ফেরেশতা জানান, তিনি চাইলে দুই পাহাড়ের মাঝখানে ওই লোকদের ধ্বংস করে দিতে পারেন।
কিন্তু রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রতিশোধ নেননি। বরং তিনি আশা প্রকাশ করেন, আল্লাহ তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ সৃষ্টি করবেন, যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।
সুবহানাল্লাহ! এই ঘটনা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অসাধারণ ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা এবং মানুষের হেদায়েতের প্রতি তাঁর গভীর আকাঙ্ক্ষার শিক্ষা দেয়।
শিক্ষা: মানুষের কাছ থেকে কষ্ট পেলেও ধৈর্য ধারণ করা, প্রতিশোধের পরিবর্তে কল্যাণ কামনা করা এবং মানুষের হেদায়েতের আশা রাখা মহান চরিত্রের পরিচয়।
হাদিসের রেফারেন্স:
– সহিহ বুখারি, হাদিস ৩২৩১ — রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কষ্ট ও পাহাড়ের ফেরেশতার ঘটনা
তথ্যগত সতর্কতা: সহিহ বুখারির এই নির্দিষ্ট বর্ণনায় আকাবার দিনের কথা এসেছে; সেখানে ঘটনাস্থল হিসেবে সরাসরি তায়েফের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তাই তায়েফের ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে এই বর্ণনাকে একেবারে অভিন্ন বলে উপস্থাপন না করাই ভালো।

৭. এই ঘটনাগুলোর মূল শিক্ষা: আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল
হযরত ইবরাহিম (আ.), হযরত হাজেরা (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর ঘটনাগুলো আমাদের আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার শিক্ষা দেয়। একইভাবে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের কঠিন সময়গুলো আমাদের ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দেয়।
হযরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশ পালন করেছেন এবং তাঁর কাছে দোয়া করেছেন। হযরত হাজেরা (আ.) আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে সন্তানের জন্য পানির সন্ধানে সাফা-মারওয়ার মধ্যে সাতবার ছুটেছেন। আল্লাহ তাঁর রহমতে তাঁদের পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
জমজমের পানির আবির্ভাব, ফেরেশতার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য এবং জুরহুম গোত্রের বসতি স্থাপনের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহ চাইলে কঠিন পরিস্থিতিতেও মানুষের জন্য সাহায্যের পথ খুলে দিতে পারেন।
তাওয়াক্কুল মানে শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করা নয়; বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করাও।
হযরত হাজেরা (আ.)-এর জীবন থেকে বিশেষ করে মায়েদের ও বোনদের জন্য শিক্ষা হলো—কঠিন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে এবং নিজের দায়িত্ব পালনে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
আর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন থেকে আমরা শিখি, মানুষের কাছ থেকে কষ্ট পেলেও ধৈর্য হারানো উচিত নয়। সম্ভব হলে প্রতিশোধের পরিবর্তে তাদের কল্যাণ ও হেদায়েত কামনা করা উচিত।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর ওপর যথাযথ তাওয়াক্কুল করার, বিপদে ধৈর্য ধারণ করার এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জমজমের 17 টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর…
১. জমজমের কূপ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছিল? উত্তর: আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে জমজমের পানির উৎস সৃষ্টি হয়। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, শিশু হযরত ইসমাইল (আ.)-এর পায়ের ধাক্কার কাছে জমজমের পানি বের হয়ে আসে। সুবহানাল্লাহ!

২. জনমানবহীন মরুভূমিতে হযরত হাজেরা (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.) কীভাবে এলেন? উত্তর: আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইবরাহিম (আ.) তাঁদের মক্কার অনুর্বর উপত্যকায় রেখে এসেছিলেন।
৩. মক্কায় কীভাবে জনবসতি গড়ে উঠেছিল? উত্তর: জমজমের পানির সন্ধান পেয়ে জুরহুম গোত্রের লোকেরা হযরত হাজেরা (আ.)-এর অনুমতি নিয়ে সেখানে বসতি স্থাপন করে।
৪. মরুভূমিতে রেখে যাওয়ার সময় হযরত ইসমাইল (আ.)-এর বয়স কত ছিল? উত্তর: সহিহ বুখারিতে তাঁকে দুধের শিশু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; নির্দিষ্ট বয়স বলা হয়নি।
৫. প্রশ্ন: হযরত হাজেরা (আ.)-এর সাফা-মারওয়ার দৌড়কে আল্লাহ কেন হজ ও উমরাহর গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতে পরিণত করেছেন? উত্তর: পানির সন্ধানে হযরত হাজেরা (আ.)-এর সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাতবার দৌড়াদৌড়ি আল্লাহর কাছে এতই পছন্দনীয় হয়েছে যে, তাঁর সেই প্রচেষ্টার স্মৃতিস্বরূপ আল্লাহ হজ ও উমরাহ পালনকারীদের জন্য এই দুই পাহাড়ের মধ্যে সাঈ করাকে ইবাদতের অংশ করেছেন। সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৬৪ | Surah ইবরাহিম, verse ৩৭

৬.।জুরহুম গোত্র কীভাবে জমজমের পানি ও মক্কার বসতির সঙ্গে যুক্ত হলো? উত্তর: তারা পানির সন্ধান পেয়ে হযরত হাজেরা (আ.)-এর অনুমতি নিয়ে সেখানে বসতি স্থাপন করেছিল। সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৬৪ | Surah ইবরাহিম, verse ৩৭
৭. প্রশ্ন: জমজমের পানি কি দাঁড়িয়ে পান করতে হয়? উত্তর: জমজমের পানি দাঁড়িয়ে পান করা জায়েজ। সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে জমজমের পানি পান করেছিলেন। তবে বসেও পান করা যায়। সহিহ বুখারি, হাদিস ১৬৩৭ | সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০২৭
৮. প্রশ্ন: জমজম কূপের পানি সর্বপ্রথম কে পান করেছিলেন? উত্তর: প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, জমজমের পানি সর্বপ্রথম হযরত হাজেরা (আ.) ও তাঁর শিশুপুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) পান করেছিলেন। সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৬৪
৯. প্রশ্ন: জমজম কূপের বৈজ্ঞানিক রহস্য কী? উত্তর: জমজম কূপের বিশেষত্ব হলো, দীর্ঘকাল ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষ পানি পান করলেও এর পানি সরবরাহ প্রাকৃতিক ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহের মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। এর পানির উৎস, ভূতাত্ত্বিক গঠন ও পানির গুণাগুণ বৈজ্ঞানিকভাবে গবেষণার বিষয়।তথ্যসূত্র: সৌদি ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (SGS)
১০. প্রশ্ন: জমজম কূপের গভীরতা কত? উত্তর: জমজম কূপের গভীরতা প্রায় ৩০.৫ মিটার (প্রায় ১০০ ফুট)। তথ্যসূত্র: সৌদি ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (SGS)
১১. প্রশ্ন: জমজম কূপের পানি কোথায় পাওয়া যায়? উত্তর: জমজমের পানি সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে মসজিদুল হারামের ভেতরে পবিত্র কাবাঘরের কাছাকাছি অবস্থিত জমজম কূপ থেকে পাওয়া যায়। বর্তমানে নির্দিষ্ট পানির বিতরণকেন্দ্রের মাধ্যমেও হাজি ও উমরাহ পালনকারীরা এই পানি পান করতে পারেন।
১২. প্রশ্ন: জমজম কূপের পানি পান করার নিয়ম কী? উত্তর: জমজমের পানি বিসমিল্লাহ বলে পান করা, আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা উত্তম। দাঁড়িয়ে বা বসে—উভয়ভাবেই পান করা যায়। রাসুলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে জমজমের পানি পান করেছিলেন।সহিহ বুখারি, হাদিস ১৬৩৭ | সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০২৭
১৩. প্রশ্ন: জমজমের পানি পান করার দোয়া ও অর্থ কী?
দোয়া: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا وَاسِعًا، وَشِفَاءً مِنْ كُلِّ دَاءٍ
অর্থ: হে আল্লাহ! উপকারী জ্ঞান, প্রশস্ত রিজিক ও সব রোগ থেকে আরোগ্য চাই।

14. প্রশ্ন: জমজমের পানি পান করার নিয়ম ও আদব কী?
উত্তর:
- কিবলামুখী হওয়া: কিবলার দিকে মুখ করে পান করা।
- বিসমিল্লাহ বলা: পান শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা।
- ডান হাতে পান করা: ডান হাত দিয়ে পানি পান করা।
- তিন নিঃশ্বাসে পান করা: বিরতি দিয়ে তিন নিঃশ্বাসে পান করা।
- দাঁড়িয়ে বা বসে পান করা: উভয়ভাবেই পান করা যায়; রাসুলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে জমজমের পানি পান করেছেন।
- তৃপ্তিসহ পান করা: পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করা।
- আলহামদুলিল্লাহ বলা: পান শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা।
- দোয়া করা: কল্যাণ, উপকারী জ্ঞান ও সুস্থতার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা।
রেফারেন্স: সহিহ বুখারি, হাদিস ১৬৩৭ | সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩০৬২
১৫. প্রশ্ন: জমজমের পানি পান করার উপকারিতা কী? উত্তর: জমজমের পানি বরকতময়। হাদিসে এসেছে, “জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, তা সেই উদ্দেশ্যের জন্য।” তাই মুসলমানেরা উপকারী জ্ঞান, সুস্থতা, রিজিক ও কল্যাণের নিয়তে জমজমের পানি পান করে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। তবে পান করলেই নির্দিষ্ট ফল নিশ্চিত হবে—এমন বিশ্বাস না রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে।সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩০৬২
১৬. প্রশ্ন: জমজমের পানির সঙ্গে সাধারণ পানি মিশিয়ে পান করা যাবে কি? উত্তর: হ্যাঁ, জমজমের পানির সঙ্গে সাধারণ পানি মিশিয়ে পান করা জায়েজ। এতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে জমজমের পানি আলাদাভাবেও পান করা যায়।
17. প্রশ্ন: জমজম কূপের পানি সর্বপ্রথম কে পান করেছিলেন? উত্তর: প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, জমজমের পানি সর্বপ্রথম হযরত হাজেরা (আ.) ও তাঁর শিশুপুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) পান করেছিলেন। সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৬৪
মিজানুর রহমান আজহারীর ভিডিও দেখুন।
কুরআন ও হাদিসের রেফারেন্স
📖 পবিত্র কুরআনের রেফারেন্স
১. হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া ও মক্কার অনুর্বর উপত্যকা
Surah ইবরাহিম, আয়াত ৩৭ — পড়ুন
২. সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের ধর্মীয় গুরুত্ব
Surah আল-বাকারা, আয়াত ১৫৮ — পড়ুন
৩. হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর কাবাঘর নির্মাণ
Surah আল-বাকারা, আয়াত ১২৭ — পড়ুন
📚 হাদিসের রেফারেন্স
১. হযরত হাজেরা (আ.), জমজমের পানির আবির্ভাব ও জুরহুম গোত্রের আগমন
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৬৪ — পড়ুন
২. জমজমের পানি পান করার বর্ণনা
সহিহ বুখারি, হাদিস ১৬৩৭ — পড়ুন
লেখক ও প্রকাশনা: আলোর দিশা ২৪ টিম তত্ত্বাবধানে: আলোর দিশা ২৪ টিম
