Play Tube ভিডিও

মূসা (আ.) মহান আল্লাহকে দেখার বিস্ময়কর ঘটনা || মিজানুর রহমান আজহারী

মূসা (আ.) মহান আল্লাহকে দেখার ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় একটি ঘটনা। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, হজরত মূসা (আ.) মহান আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার পর তাঁকে দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন। তূর পাহাড়ে সংঘটিত এই ঘটনা থেকে আমরা মহান আল্লাহর মহত্ত্ব, ক্ষমতা এবং মানুষের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করি। এই আলোচনায় মিজানুর রহমান আজহারী ঘটনাটির তাৎপর্য তুলে ধরেছেন।

সংক্ষিপ্ত সারাংশ

হজরত মূসা (আলাইহিস সালাম) ছিলেন আল্লাহর একজন সম্মানিত নবী। আল্লাহ তাআলা তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার বিশেষ মর্যাদা দান করেছিলেন। একদিন মূসা (আ.) আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনের সময় তাঁকে দেখার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে জানিয়ে দেন, পার্থিব জীবনে তিনি আল্লাহকে দেখতে পারবেন না। এরপর আল্লাহ পাহাড়ের দিকে তাকাতে বলেন। যখন আল্লাহর তাজাল্লি পাহাড়ে প্রকাশিত হয়, তখন পাহাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং মূসা (আ.) অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

এই ঘটনা আল্লাহর অসীম মহিমা, মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং ঈমানের গভীর শিক্ষা তুলে ধরে। পাশাপাশি কুরআন ও সহীহ হাদিসে বর্ণিত সাত আসমান, সিদরাতুল মুনতাহা, বাইতুল মামুর, আরশ ও কুরসি সম্পর্কে জানার মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টিজগতের বিশালতা উপলব্ধি করা যায়।

সম্পূর্ণ আলোচনাটি দুটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে, প্রথম পর্ব ও দ্বিতীয় পর্ব। উভয় পর্ব এখানে সংযুক্ত রয়েছে।

আলোচনা…

মূসা (আ.) কেন আল্লাহকে দেখতে চেয়েছিলেন?

আল্লাহ তাআলা মূসা (আ.)-কে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিলেন। তিনি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার সৌভাগ্য লাভ করেন। এই বিশেষ কথোপকথনের সময় তিনি আল্লাহকে প্রত্যক্ষ করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন।

মূসা (আ.) বলেছিলেন:

হে আমার রব! আমাকে দর্শন দান করুন, আমি আপনাকে দেখব।

— সূরা আল-আ’রাফ, আয়াত ১৪৩ (ভাবানুবাদ)

এটি ছিল একজন নবীর তাঁর প্রতিপালককে দেখার আকাঙ্ক্ষা। তবে কুরআনে এই আকাঙ্ক্ষার পেছনে বিস্তারিত কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণ বর্ণিত হয়নি।

মূসা (আ.) মহান আল্লাহকে দেখার বিস্ময়কর ঘটনা

আল্লাহ তাআলা কী উত্তর দিয়েছিলেন?

আল্লাহ তাআলা মূসা (আ.)-কে জানালেন যে তিনি তাঁকে দেখতে পারবেন না। এরপর তাঁকে পাহাড়ের দিকে তাকাতে বলা হলো। পাহাড় যদি নিজ অবস্থানে স্থির থাকতে পারে, তাহলে মূসা (আ.) আল্লাহকে দেখতে পারবেন।

এখানে মানুষের পার্থিব ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। আল্লাহর সত্তা ও মহিমাকে মানুষের সাধারণ দৃষ্টিশক্তি দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

তূর পাহাড়ে কী ঘটেছিল?

যখন আল্লাহ তাআলা পাহাড়ে তাজাল্লি প্রকাশ করলেন, তখন পাহাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। মূসা (আ.) অজ্ঞান হয়ে পড়লেন।

জ্ঞান ফিরে পেয়ে তিনি আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করলেন, তওবা করলেন এবং নিজেকে মুমিনদের মধ্যে প্রথম বলে ঘোষণা করলেন।

এই ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, পৃথিবীর বিশাল পাহাড়ও আল্লাহর মহিমার সামনে স্থির থাকতে পারেনি। মানুষ যত শক্তিশালীই হোক, আল্লাহর সামনে সে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।

মূসা (আ.) মহান আল্লাহকে দেখার বিস্ময়কর ঘটনা

সাত আসমান ও সিদরাতুল মুনতাহা

কুরআনে সাত আসমানের কথা উল্লেখ রয়েছে। সিদরাতুল মুনতাহার উল্লেখ রয়েছে সূরা আন-নাজমে। সহীহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মিরাজের বর্ণনায় সিদরাতুল মুনতাহা, বাইতুল মামুর এবং চারটি নদীর কথা এসেছে।

এই বিষয়গুলো আল্লাহর সৃষ্টির বিস্ময়কর নিদর্শন। তবে মূসা (আ.)-এর তূর পাহাড়ের ঘটনার সঙ্গে এগুলোকে একক ঘটনাক্রম হিসেবে মিলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

আরশ, কুরসি ও লাওহে মাহফুজ

আল্লাহর আরশ ও কুরসির কথা কুরআনে উল্লেখ রয়েছে। লাওহে মাহফুজের কথাও কুরআনে এসেছে। এগুলো গায়েবের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। এ সম্পর্কে কুরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসে যতটুকু বর্ণিত হয়েছে, ততটুকুই বিশ্বাস করা এবং অপ্রমাণিত বিবরণ থেকে বিরত থাকা মুমিনের কর্তব্য।

মূসা (আ.) মহান আল্লাহকে দেখার বিস্ময়কর ঘটনা

কুরআনের দলিল

দলিল ১: মূসা (আ.)-এর আল্লাহকে দেখার আকাঙ্ক্ষা

সূরা আল-আ’রাফ — ৭:১৪৩

আরবি আয়াতের মূল অংশ:

رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ ۚ قَالَ لَن تَرَانِي

বাংলা অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দান করুন, আমি আপনাকে দেখব। তিনি বললেন, তুমি আমাকে দেখতে পারবে না।

একই আয়াতের পরবর্তী অংশে পাহাড়ে আল্লাহর তাজাল্লি, পাহাড়ের চূর্ণ হওয়া এবং মূসা (আ.)-এর অজ্ঞান হয়ে পড়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

সম্পূর্ণ আয়াত: সূরা আল-আ’রাফ ৭:১৪৩

দলিল ২: মূসা (আ.)-এর বিশেষ মর্যাদা

সূরা আল-আ’রাফ — ৭:১৪৪

আল্লাহ মূসা (আ.)-কে জানান যে তিনি তাঁকে তাঁর বার্তা ও কথোপকথনের মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁকে আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত গ্রহণ করতে এবং কৃতজ্ঞ হতে নির্দেশ দেন।

মূসা (আ.) মহান আল্লাহকে দেখার বিস্ময়কর ঘটনা

আয়াত ও অনুবাদ পড়ুন

দলিল ৩: সাত আসমানের সৃষ্টি

সূরা আল-মুলক — ৬৭:৩

আল্লাহ তাআলা সাত আসমান স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন। এ আয়াত তাঁর সৃষ্টির সুশৃঙ্খলতা ও নিখুঁত ব্যবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

আয়াত ও অনুবাদ পড়ুন

দলিল ৪: সিদরাতুল মুনতাহা

সূরা আন-নাজম — ৫৩:১৩–১৮

এই আয়াতগুলোতে সিদরাতুল মুনতাহা, জান্নাতুল মাওয়া এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মহান নিদর্শন প্রত্যক্ষ করার বিষয় উল্লেখ রয়েছে।

আয়াতগুলো পড়ুন

দলিল ৫: আল্লাহর কুরসি

সূরা আল-বাকারা — ২:২৫৫ (আয়াতুল কুরসি)

আল্লাহর কুরসি আসমান ও জমিনকে পরিবেষ্টন করে আছে। আসমান ও জমিনের রক্ষণাবেক্ষণ তাঁকে ক্লান্ত করে না। তিনি সর্বোচ্চ, সুমহান।

القرآن الكريم

আয়াতুল কুরসি পড়ুন

দলিল ৬: আল্লাহর আরশ

সূরা আল-হাক্কাহ — ৬৯:১৭

এ আয়াতে কিয়ামতের দিন আটজন ফেরেশতার আল্লাহর আরশ বহনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

আয়াত ও অনুবাদ পড়ুন

দলিল ৭: লাওহে মাহফুজ

সূরা আল-বুরুজ — ৮৫:২১–২২

আল্লাহ তাআলা মহিমান্বিত কুরআনের কথা উল্লেখ করেছেন, যা সংরক্ষিত ফলকে রয়েছে।

আয়াতগুলো পড়ুন

সহীহ হাদিসের দলিল

হাদিস ১: আখিরাতে আল্লাহকে দেখার সৌভাগ্য

সহীহ বুখারী — হাদিস ৭৪৩৬

জারীর ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) পূর্ণিমার চাঁদের দিকে ইঙ্গিত করে সাহাবিদের জানান, কিয়ামতের দিন তাঁরা তাঁদের প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে দেখতে পাবেন, যেমন পূর্ণিমার চাঁদ দেখতে কোনো অসুবিধা হয় না।

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, আখিরাতে আল্লাহকে দেখার বিষয়টি সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। এখানে দেখার স্পষ্টতার তুলনা করা হয়েছে, আল্লাহর সত্তাকে চাঁদের সঙ্গে তুলনা করা হয়নি।

সূত্র: সহীহ বুখারী ৭৪৩৬

হাদিস ২: সিদরাতুল মুনতাহা ও চারটি নদী

সহীহ বুখারী — হাদিস ৩২০৭

মিরাজের বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) সিদরাতুল মুনতাহার কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে চারটি নদীর বর্ণনা রয়েছে। দুটি নদী অভ্যন্তরীণ, যা জান্নাতের সঙ্গে সম্পর্কিত; অপর দুটি নদীকে নীলনদ ও ফোরাত হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই হাদিস আল্লাহর সৃষ্টির বিস্ময়কর নিদর্শন সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেয়।

সূত্র: সহীহ বুখারী ৩২০৭

হাদিস ৩: বাইতুল মামুর ও সত্তর হাজার ফেরেশতা

সহীহ বুখারী — হাদিস ৩২০৭

একই হাদিসে বাইতুল মামুরের কথা এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানানো হয়, প্রতিদিন সেখানে সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন। তাঁরা বেরিয়ে যাওয়ার পর পুনরায় সেখানে ফিরে আসেন না।

এটি ফেরেশতাদের ইবাদত এবং আল্লাহর সৃষ্টির বিশালতার একটি নিদর্শন।

সূত্র: সহীহ বুখারী ৩২০৭

হাদিস ৪: আল্লাহকে দেখার বিশ্বাস ও সালাতের গুরুত্ব

সহীহ বুখারী — হাদিস ৭৪৩৪

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের আল্লাহকে দেখার সৌভাগ্যের কথা জানানোর পর বিশেষভাবে ফজর ও আসরের সালাত যথাযথভাবে আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।

এই হাদিস আমাদের শেখায়, আখিরাতের প্রতি আশা শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়; নিয়মিত ইবাদতের মাধ্যমেও তা প্রকাশ করতে হয়।

সূত্র: সহীহ বুখারী ৭৪৩৪

আলোচনা থেকে শিক্ষা

মূসা (আ.)-এর ঘটনা আমাদের ঈমানি জীবনের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।

আল্লাহর মহত্ত্ব উপলব্ধি: আল্লাহর তাজাল্লিতে পাহাড় চূর্ণ হওয়ার ঘটনা তাঁর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিনয় ও আত্মসমর্পণ: মূসা (আ.) জ্ঞান ফিরে পেয়েই আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করেন এবং তাঁর দিকে ফিরে আসেন। একজন মুমিনেরও উচিত সর্বাবস্থায় আল্লাহর সামনে বিনয়ী থাকা।

গায়েবের প্রতি বিশ্বাস: মানুষের জ্ঞান ও দৃষ্টিশক্তি সীমিত। কুরআন ও সহীহ হাদিসে বর্ণিত গায়েবি বিষয়গুলোকে বিশ্বাস করা ঈমানের অংশ।

তওবার গুরুত্ব: আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং তাঁর ক্ষমা প্রার্থনা করা মুমিনের অন্যতম সুন্দর গুণ।

আখিরাতের প্রস্তুতি: আখিরাতে আল্লাহকে দেখার সৌভাগ্য সম্পর্কে সহীহ হাদিসের বর্ণনা মুমিনকে নেক আমলের প্রতি উৎসাহিত করে।

করণীয় / কী আমল করা যায়

1. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা: বিশেষভাবে ফজর ও আসরের সালাতের প্রতি যত্নবান হওয়া।

2. নিয়মিত তওবা ও ইস্তিগফার করা: নিজের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

3. আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করা: বেশি বেশি ‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠ করা এবং আল্লাহর মহিমা স্মরণ করা।

4. কুরআন অর্থসহ অধ্যয়ন করা: বিশেষভাবে সূরা আল-আ’রাফের ১৪২–১৪৫ নম্বর আয়াত পড়া ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করা।

5. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা: আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতগুলো স্মরণ করে তাঁর শুকরিয়া আদায় করা।

6. অপ্রমাণিত ধর্মীয় বর্ণনা থেকে বিরত থাকা: কুরআন ও সহীহ হাদিসের ভিত্তিতে দ্বীনের বিষয়গুলো জানা ও অন্যদের জানানো।

উপসংহার

মূসা (আ.)-এর আল্লাহকে দেখার আকাঙ্ক্ষা এবং তূর পাহাড়ে তাজাল্লির ঘটনা আল্লাহর অসীম মহিমার এক গভীর নিদর্শন। যে পাহাড় মানুষের চোখে অটল ও শক্তিশালী, সেই পাহাড়ও আল্লাহর তাজাল্লিতে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।

এই ঘটনা আমাদের শেখায়, আল্লাহর সামনে মানুষের শক্তি ও সামর্থ্য অত্যন্ত সীমিত। তাই মুমিনের উচিত আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমান রাখা, তাঁর আদেশ মেনে চলা, তওবা করা এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

শ্রমিকের সঙ্গে কেমন আচরণ করবেন? ইসলামের শিক্ষা ও কঠিন সতর্কবার্তা

“নবীজির সুন্নাহ, সৌন্দর্যচর্চা, মেসওয়াক ও নারীদের সাজসজ্জার বিধান” মিজানুর রহমান আজহারী

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।