Play Tube video
“নবীজির সুন্নাহ, সৌন্দর্যচর্চা, মেসওয়াক ও নারীদের সাজসজ্জার বিধান” মিজানুর রহমান আজহারী
ভিডিওর মূল বিষয়বস্তু একনজরে:
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে মেসওয়াকের গুরুত্ব, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যচর্চা ও সুন্নতি প্রসাধনী ব্যবহারের অনন্য শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) কীভাবে মেসওয়াক করতেন, তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রীর মধ্যে কী কী জিনিস থাকত, কেন তিনি মেসওয়াক ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি এত গুরুত্ব দিতেন এবং নারীদের সাজসজ্জা ও সুগন্ধি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা কী—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে হৃদয়স্পর্শী আলোচনা করেছেন জনপ্রিয় ইসলামিক আলোচক শায়খ মিজানুর রহমান আজহারী। পাশাপাশি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা, নারীদের প্রতি সম্মান, সালাতের প্রশান্তি এবং দৈনন্দিন জীবনে নবীজির সুন্নাহ অনুসরণের গুরুত্বও এই বয়ানে তুলে ধরা হয়েছে।
বয়ান থেকে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি পয়েন্ট
1. বিশ্বনবী (সা.) কেন মেসওয়াক করতেন? মুখ ও দাঁত পরিষ্কার রাখা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মেসওয়াক করতেন।
2. মেসওয়াকের গুরুত্ব কী? মেসওয়াক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। এটি মুখ পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
3. বিশ্বনবী (সা.) কি সৌন্দর্যচর্চা করতেন? হ্যাঁ, তিনি ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, চুল ও দাড়ির যত্ন এবং সুগন্ধি ব্যবহারে গুরুত্ব দিতেন।
4. পুরুষদের জন্য প্রসাধনী ব্যবহার কি বৈধ? হ্যাঁ, ইসলামের বিধান মেনে পুরুষরা তেল, চিরুনি ও ত্বকের যত্নের বৈধ সামগ্রী ব্যবহার করতে পারেন।
5. বিশ্বনবী (সা.) কী ধরনের সুগন্ধি পছন্দ করতেন? রাসুলুল্লাহ (সা.) সুগন্ধি পছন্দ করতেন। হাদিসে সুগন্ধির প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা এসেছে।
6. বিশ্বনবী (সা.) নারীদের কীভাবে সম্মান করতেন? তিনি নারীদের প্রতি সদাচরণ, ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন করতেন এবং কন্যাসন্তানদের স্নেহ করতেন।
7. নারীরা কি মেহেদি ও লিপস্টিক ব্যবহার করতে পারবেন? শরিয়তের সীমার মধ্যে বৈধ প্রসাধনী ব্যবহার করতে পারবেন। তবে পরপুরুষের সামনে নিষিদ্ধভাবে সৌন্দর্য প্রদর্শন করা যাবে না।
8. নারীদের সুগন্ধি ব্যবহারে হাদিসের সতর্কতা কী? পরপুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে সুগন্ধি ব্যবহার করে তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে হাদিসে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে।
9. বিশ্বনবী (সা.)-এর কাছে সালাতের গুরুত্ব কতটুকু ছিল? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সালাতের মধ্যে তাঁর চোখের শীতলতা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সালাত ছিল তাঁর প্রশান্তির অন্যতম উৎস।

10. বিশ্বনবীর সুন্নাহ অনুসরণের মূল শিক্ষা কী? দৈনন্দিন জীবনে পরিচ্ছন্নতা, শালীনতা, উত্তম চরিত্র ও নিয়মিত ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা।
এই বয়ানের মূল শিক্ষা
বিশ্বনবী (সা.)-এর জীবন থেকে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, মেসওয়াকের গুরুত্ব, নারীদের প্রতি সম্মান, শালীন সৌন্দর্যচর্চা এবং সালাতের মাধ্যমে আত্মিক প্রশান্তি অর্জনের শিক্ষা পাওয়া যায়।
এই বয়ান থেকে করণীয় আমল
প্রতিদিন মেসওয়াক করা, শরীর ও পোশাক পরিচ্ছন্ন রাখা, বৈধ সৌন্দর্যচর্চায় শালীনতা বজায় রাখা, নারীদের সম্মান করা এবং নিয়মিত সালাত আদায় করা।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যচর্চার জন্য কী কী সামগ্রী ব্যবহার করতেন?
1. মেসওয়াক (السواك): দাঁত ও মুখ পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহার করতেন।
2. চিরুনি (المشط): চুল ও দাড়ি পরিপাটি রাখার জন্য ব্যবহার করতেন।
3. সুরমাদানি (المكحلة): চোখে সুরমা ব্যবহারের সামগ্রী।
4. সুগন্ধি (الطيب): রাসুলুল্লাহ (সা.) সুগন্ধি পছন্দ করতেন এবং ব্যবহার করতেন।
5. আয়না (المرآة) ব্যবহার করতেন।
6. জয়তুনের তেল (زيت الزيتون): চুল, দাড়ি ও শরীরের পরিচর্যায় ব্যবহারের জন্য।

বিশ্বনবীর সন্তান সংখ্যা:
প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোট ৭ জন সন্তান ছিলেন—৩ জন ছেলে ও ৪ জন মেয়ে।
অনুগ্রহ করে অডিও রেফারেন্সটি শুনে দেখবেন।
বিশ্বনবীর তিন ছেলে:
কাসিম (রা.), আবদুল্লাহ (রা.) ও ইবরাহিম (রা.)। তিনজনই শৈশবে ইন্তেকাল করেন।
বিশ্বনবীর চার মেয়ে:
জয়নব (রা.), রুকাইয়া (রা.), উম্মে কুলসুম (রা.) ও ফাতিমা (রা.)। চারজনই প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছিলেন।

সন্তানদের মধ্যে কে বেঁচে ছিলেন:
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সাত সন্তানের মধ্যে ছয়জন তাঁর জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন। একমাত্র কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.) পিতার ইন্তেকালের সময় জীবিত ছিলেন। তিনিও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের প্রায় ছয় মাস পর মৃত্যুবরণ করেন।
কোন স্ত্রীর গর্ভে কতজন সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলেন?
- হযরত খাদিজা (রা.): ৬ জন সন্তান—২ ছেলে (কাসিম ও আবদুল্লাহ) এবং ৪ মেয়ে (জয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা)।
- হযরত মারিয়া আল-কিবতিয়া (রা.): ১ ছেলে—ইবরাহিম। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁকে নবীজির স্ত্রী নয়, দাসী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
- অন্যান্য স্ত্রী: তাঁদের কারও গর্ভে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করেননি।
বিস্তারিত জানতে ভিডিওটি দেখুন
নারীদের প্রতি ভালোবাসা ও বিশেষ মর্যাদা
মহান আল্লাহ নারীদের যে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তা যথাযথভাবে রক্ষা করেছেন। তাঁর চার কন্যা ও তিন পুত্রসন্তান ছিলেন। পুত্ররা শৈশবেই ইন্তেকাল করলেও তিনি কন্যাদের গভীর স্নেহ, ভালোবাসা ও আদরে বড় করেছেন। বিশেষ করে কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অনন্য। নারীদের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সদাচরণের মাধ্যমে তিনি সমগ্র মানবজাতির জন্য এক অনুপম আদর্শ স্থাপন করেছেন।

ইসলামে নারীদের সাজসজ্জা, প্রসাধনী ও সুগন্ধি ব্যবহারের বিধান
১. নারীরা কি কসমেটিকস ব্যবহার করতে পারবেন? উত্তর: হ্যাঁ। ইসলাম নারীদের বৈধ প্রসাধনী ব্যবহার ও সৌন্দর্যচর্চার অনুমতি দিয়েছে, তবে তা শরিয়তের সীমার মধ্যে হতে হবে।
২. নারীরা কি কসমেটিকস ব্যবহার করে ঘরের বাইরে যেতে পারবেন? উত্তর: শর্তসাপেক্ষে পারবেন। সাধারণ পরিচ্ছন্নতা ও ত্বকের যত্নে প্রসাধনী ব্যবহার নিষিদ্ধ নয়। তবে পরপুরুষের সামনে নিষিদ্ধভাবে সৌন্দর্য প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

৩. ইসলাম কেন প্রকাশ্যে সৌন্দর্য প্রদর্শনে নিষেধ করেছে? পবিত্র কুরআনের সুরা আন-নূর (২৪:৩১)-এ নারীদের শালীনতা বজায় রাখা এবং নির্ধারিত ব্যতিক্রম ছাড়া সৌন্দর্য প্রকাশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৪. নারীর সৌন্দর্য কার জন্য প্রদর্শন করা উচিত? স্বামীর জন্য সাজসজ্জা করা ইসলামে বৈধ ও প্রশংসনীয়। পাশাপাশি কুরআনে উল্লেখিত মাহরাম আত্মীয় ও নির্ধারিত ব্যক্তিদের সামনে শরিয়তের সীমার মধ্যে সৌন্দর্য প্রকাশের অনুমতি রয়েছে।
৫. নারীরা সুগন্ধি ব্যবহার করে বাইরে গেলে হাদিসে কী বলা হয়েছে? রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন নারীদের কঠোর সতর্ক করেছেন, যারা সুগন্ধি মেখে পরপুরুষদের পাশ দিয়ে যায়, যাতে তারা সেই সুগন্ধ অনুভব করে। হাদিসে এ আচরণকে ব্যভিচারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (সুনান আবু দাউদ ৪১৭৩; জামে তিরমিজি ২৭৮৬)
৬. অশালীন সাজসজ্জা করে বাইরে বের হলে কি নারীরা ধর্ষণের শিকার হন? অশালীন সাজসজ্জা ধর্ষণের কারণ বা অনিবার্য পরিণতি—এমন দাবি সঠিক নয়। যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের দায় সম্পূর্ণ অপরাধীর। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই শালীনতা বজায় রাখতে এবং অন্যের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখাতে নির্দেশ দিয়েছে।
৭. নারীদের নিরাপত্তা ও শালীনতা সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষা কী? ইসলাম নারীদের শালীন পোশাক ও আচরণের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি পুরুষদের দৃষ্টি সংযত রাখা এবং অশালীন আচরণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। (সুরা আন-নূর ২৪:৩০–৩১)
মিজানুর রহমান আজহারীর আলোচনার মূলভাব হলো, ইসলাম নারীদের বৈধ সাজসজ্জা ও সৌন্দর্যচর্চার অনুমতি দিয়েছে, তবে পরপুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন ও দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে সুগন্ধি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বলেছে। নারীদের শালীনতা ও মর্যাদা রক্ষা এবং স্বামীর জন্য সৌন্দর্যচর্চার গুরুত্ব তিনি তুলে ধরেছেন।

মূল শিক্ষা:
সলাম নারীদের বৈধ সৌন্দর্যচর্চার অনুমতি দিয়েছে, তবে শালীনতা বজায় রেখে পরপুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রদর্শন থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দিয়েছে। নারীর সম্মান, মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলাই এই আলোচনার মূল শিক্ষা।

আমল:
রীরা ঘরে স্বামীর জন্য বৈধ সাজসজ্জা ও সুগন্ধি ব্যবহার করবেন এবং বাইরে যাওয়ার সময় শালীন পোশাক ও পর্দার বিধান মেনে চলবেন। পরপুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে সৌন্দর্য প্রদর্শন ও সুগন্ধি ব্যবহার থেকে বিরত থাকবেন।
দলিল ও হাদিসের রেফারেন্স: বিশ্বনবী (সা.)-এর সুন্নাহ, পরিচ্ছন্নতা, নারীদের মর্যাদা ও সৌন্দর্যচর্চা
১. মেসওয়াকের গুরুত্ব ও ফজিলত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, উম্মতের জন্য কষ্টকর না হলে তিনি প্রত্যেক সালাতের সময় মেসওয়াক করার নির্দেশ দিতেন। দলিল: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৮৮৭।
২. নারী, সুগন্ধি ও সালাতের প্রতি ভালোবাসা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুনিয়ার মধ্যে নারী ও সুগন্ধি তাঁর প্রিয় করা হয়েছে এবং সালাতের মধ্যে তাঁর চোখের শীতলতা রাখা হয়েছে। দলিল: সুনানে নাসাঈ, হাদিস নং ৩৯৩৯ (হাসান)। ki
৩. নারীদের সুগন্ধি ব্যবহার সম্পর্কে সতর্কবাণী রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন নারীদের ব্যাপারে কঠোর সতর্ক করেছেন, যারা সুগন্ধি ব্যবহার করে লোকদের পাশ দিয়ে যায়, যাতে তারা সুগন্ধ অনুভব করে। দলিল: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪১৭৩ (হাসান)।
৪. ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার সুন্নাহ ইসলামের স্বভাবজাত পরিচ্ছন্নতার বিধানগুলোর মধ্যে নখ কাটা, বগলের লোম পরিষ্কার করা ও গোঁফ ছোট করার কথা উল্লেখ রয়েছে। দলিল: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৮৮৯।
৫. হযরত ফাতিমা (রা.)-এর ইন্তেকাল হযরত আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর হযরত ফাতিমা (রা.) প্রায় ছয় মাস জীবিত ছিলেন। দলিল: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪২৪০–৪২৪১।
৬. কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ফাতিমা আমারই একটি অংশ। যে তাকে অসন্তুষ্ট করে, সে আমাকেও অসন্তুষ্ট করে। দলিল: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৭১৪।
৭. নারীদের মসজিদে যাওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের মসজিদে যাওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। দলিল: সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৪৪৩বি।
শেষ কথা:
বিশ্বনবী (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়—পরিচ্ছন্নতা, মেসওয়াক, শালীনতা, নারীদের প্রতি সম্মান ও সালাতের গুরুত্বই সুন্দর জীবনের অনন্য শিক্ষা। নবীজির সুন্নাহ অনুসরণেই রয়েছে পবিত্র জীবন গড়ার পথ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়।
