Q&A
ইসলামে জমি বন্ধক রাখা কি জায়েজ? ঋণ, সুদ ও বন্ধকি জমির ফসল নিয়ে ৭টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর | আলোর দিশা ২৪

Answer
জমি বন্ধক রাখা কি জায়েজ?
জমি বন্ধক রাখা কি জায়েজ? ইসলামে জমি বন্ধক, ঋণ নেওয়া, বন্ধকি জমির ফসল ভোগ করা, সুদ ও বৈধ লেনদেনের বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকা জরুরি। এই পোস্টে কুরআন ও হাদিসের আলোকে ৭টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইসলামে জমি বন্ধক, ঋণ ও লেনদেন সম্পর্কে ৭টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
১. ইসলামে জমি বন্ধক রাখা বা নেওয়া কি জায়েজ?
উত্তর: হ্যাঁ, ইসলামে ঋণের জামানত হিসেবে জমি বন্ধক রাখা বা নেওয়া জায়েজ, যদি লেনদেন সুদমুক্ত ও শরিয়তসম্মত হয়। 📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
২. জমি বন্ধক নেওয়া কি সুদের অন্তর্ভুক্ত? ইসলাম কী বলে?
উত্তর: না, শুধু জমি বন্ধক নেওয়া সুদ নয়; তবে ঋণের বিনিময়ে বন্ধকি জমি থেকে বিনা প্রতিদানে লাভ নেওয়া সুদের অন্তর্ভুক্ত। 📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
৩. জমি বন্ধক রেখে টাকা নিলে সেই জমির ফসল ভোগ করার অধিকার কার?
উত্তর: জমির ফসলের মূল অধিকার জমির মালিকের; ঋণদাতা শুধু টাকা ধার দেওয়ার কারণে সেই ফসল ভোগ করতে পারেন না। 📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
৪. বন্ধক রেখে টাকা ধার নেওয়া কি ইসলামে জায়েজ?
উত্তর: হ্যাঁ, ইসলামে কোনো মূল্যবান সম্পদ বন্ধক রেখে সুদমুক্ত টাকা ধার নেওয়া জায়েজ। 📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
৫. জমি বন্ধক রাখার বিনিময়ে পাওয়া টাকার ওপর কি যাকাত দিতে হবে?
উত্তর: শর্তসাপেক্ষে হ্যাঁ, বন্ধকের মাধ্যমে পাওয়া ঋণের টাকা থেকে যাকাতযোগ্য সম্পদ নিসাব পরিমাণে থাকলে এবং নির্ধারিত সময় পূর্ণ হলে ঋণের হিসাব বিবেচনায় যাকাত প্রযোজ্য হতে পারে। 📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
৬. রাসূলুল্লাহ ﷺ কি কখনো কোনো জিনিস বন্ধক রেখেছিলেন? এ সম্পর্কে সহিহ হাদিসে কী বলা হয়েছে?
উত্তর: হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ ﷺ একজন ইহুদির কাছ থেকে বাকিতে খাদ্যশস্য কিনে নিজের লোহার বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন। (সহিহ বুখারি: ২০৬৮) 📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
৭. ইসলামে একটি জিনিসের বিনিময়ে অন্য জিনিস আদান-প্রদান করা কি জায়েজ?
উত্তর: হ্যাঁ, ইসলামে পণ্যের বিনিময়ে পণ্য আদান-প্রদান জায়েজ, যদি লেনদেন পারস্পরিক সম্মতিতে হয় এবং সুদসহ নিষিদ্ধ শর্ত না থাকে। 📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
ইসলামে জমি বন্ধক রাখা, সুদ, ঋণ, যাকাত ও পণ্য বিনিময়: কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে ৭টি বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্য, ঋণ নেওয়া, জমি বন্ধক রাখা এবং পণ্য বিনিময়ের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। অনেকেই জানতে চান, জমি বন্ধক রাখা কি জায়েজ, বন্ধকি জমির ফসল কে ভোগ করবে কিংবা ঋণের টাকার ওপর যাকাত দিতে হবে কি না। এসব বিষয়ে ভুল ধারণার কারণে অনেক সময় বৈধ লেনদেনকেও হারাম মনে করা হয়, আবার সুদযুক্ত লেনদেনকে বৈধ মনে করা হয়।
নিচে বাস্তব জীবনের এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর কুরআন, সহিহ হাদিস ও ইসলামি ফিকহের আলোকে ব্যাখ্যা করা হলো। কুরআনের আয়াতের জন্য আলোর দিশা ২৪ — আল-কুরআন এবং হাদিসের জন্য পৃথক উৎসের ব্যাকলিংক দেওয়া হয়েছে।
১. ইসলামে জমি বন্ধক রাখা বা নেওয়া কি জায়েজ?
উত্তর: হ্যাঁ, ইসলামে জমি বন্ধক রাখা বা নেওয়া জায়েজ। তবে তা হতে হবে সুদমুক্ত ও শরিয়তসম্মত। কোনো ব্যক্তি আর্থিক প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে নিজের জমি জামানত হিসেবে রাখতে পারেন। একে ইসলামি পরিভাষায় রাহন বলা হয়। বন্ধক রাখার উদ্দেশ্য ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তা দেওয়া, ঋণদাতার জন্য অতিরিক্ত লাভের ব্যবস্থা করা নয়।
যেমন, একজন ব্যক্তি এক লাখ টাকা ধার নিয়ে নিজের জমি বন্ধক রাখলেন। নির্ধারিত সময়ে টাকা ফেরত দিলে তিনি জমি বন্ধকমুক্ত করে ফেরত পাবেন। তবে ঋণদাতা শুধু বন্ধক নেওয়ার কারণে জমির মালিক হয়ে যাবেন না কিংবা বিনা প্রতিদানে জমির ফসল ভোগ করতে পারবেন না। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে পাওনা আদায় করতে হবে; ঋণদাতা ইচ্ছামতো জমি আত্মসাৎ করতে পারবেন না।
কুরআনের দলিল — সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৮৩:
وَإِن كُنتُمْ عَلَىٰ سَفَرٍ وَلَمْ تَجِدُوا كَاتِبًا فَرِهَانٌ مَّقْبُوضَةٌ
বাংলা অর্থ: আর তোমরা যদি সফরে থাকো এবং কোনো লেখক না পাও, তাহলে বন্ধকি বস্তু হস্তগত রাখা যেতে পারে। (আয়াতের অংশ)
এই আয়াতে বন্ধকের বৈধতার ভিত্তি পাওয়া যায়। আয়াতে সফরের পরিস্থিতি উল্লেখ থাকলেও রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আমল থেকে সফরের বাইরেও বন্ধক রাখার বৈধতা প্রমাণিত হয়।
হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনায় একজন ইহুদির কাছে নিজের লোহার বর্ম বন্ধক রেখে খাদ্যশস্য সংগ্রহ করেছিলেন। — সহিহ বুখারি, হাদিস ২০৬৯।
২. জমি বন্ধক নেওয়া কি সুদের অন্তর্ভুক্ত? ইসলাম কী বলে?
উত্তর: না, শুধু জমি বন্ধক নেওয়া সুদ নয়; তবে বন্ধকের মাধ্যমে ঋণদাতা অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ করলে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ইসলামে ঋণ দেওয়া একটি সহযোগিতামূলক কাজ। এর বিনিময়ে ঋণদাতা শর্তযুক্ত অতিরিক্ত অর্থ বা সুবিধা আদায় করতে পারেন না।
উদাহরণস্বরূপ, কেউ এক লাখ টাকা ধার দিয়ে শর্ত করলেন, টাকা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত তিনি বন্ধকি জমিতে বিনা ভাড়ায় চাষ করবেন এবং সব ফসল নিজে নেবেন। এ ধরনের ব্যবস্থা নাজায়েজ, কারণ ঋণের বিনিময়ে তিনি অতিরিক্ত লাভ পাচ্ছেন। এমনকি ঋণগ্রহীতা সম্মতি দিলেও ঋণের শর্ত হিসেবে বিনামূল্যে জমি ব্যবহারের সুবিধা বৈধ হয়ে যায় না। তবে ঋণ থেকে পৃথক, প্রকৃত ও ন্যায্য ভাড়ার চুক্তিতে জমি ব্যবহার করার বৈধ ব্যবস্থা থাকতে পারে।
কুরআনের দলিল — সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭৫:
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
বাংলা অর্থ: অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। (আয়াতের অংশ)
এ আয়াতে আল্লাহ বৈধ ব্যবসা ও সুদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করেছেন। কাজেই বন্ধকের নামে সুদযুক্ত সুবিধা গ্রহণ করার অনুমতি নেই।
ফিকহি ব্যাখ্যা: বন্ধকি জমি থেকে ঋণের বিনিময়ে বিনা প্রতিদানে ফসল বা অন্য সুবিধা নেওয়াকে আলেমরা নিষিদ্ধ বলেছেন। এটি বিশেষভাবে জমি বন্ধকের প্রচলিত ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ।
৩. জমি বন্ধক রেখে টাকা নিলে সেই জমির ফসল ভোগ করার অধিকার কার?
উত্তর: বন্ধকি জমির ফসল ও আয়ের মূল অধিকার জমির মালিকের, ঋণদাতার নয়। জমি বন্ধক রাখার অর্থ হলো ঋণের নিরাপত্তা হিসেবে সম্পদটি জামানত রাখা। এতে জমির মালিকানা ঋণদাতার কাছে স্থানান্তরিত হয় না।
ধরুন, একজন কৃষক দুই লাখ টাকা ধার নিয়ে পাঁচ বিঘা জমি বন্ধক রাখলেন। সেই জমিতে ধান উৎপন্ন হলে শুধু ঋণ দেওয়ার কারণে ঋণদাতা ধানের মালিক হবেন না। জমির মালিক চাইলে শরিয়তসম্মতভাবে জমি ভাড়া দিতে পারেন এবং সেই ভাড়া ঋণের পাওনার সঙ্গে সমন্বয় করতে পারেন। তবে জমি চাষের খরচ, শ্রম, বীজ এবং ফসলের হিসাবের মতো বিষয়গুলো চুক্তি অনুযায়ী ন্যায্যভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
الإسلام سؤال وجواب
কুরআনের দলিল — সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৯:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
বাংলা অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা করা বৈধ। (আয়াতের অংশ)
এই আয়াত অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা নিষিদ্ধ করেছে। বন্ধকি জমির ফসলের মালিকানার বিস্তারিত বিধান ইসলামি ফিকহ থেকে নির্ধারিত হয়।
ফিকহি দলিল: ঋণের জামানত হিসেবে রাখা জমি থেকে ঋণদাতা বিনা প্রতিদানে লাভ নিতে পারেন না। জমিতে নিজে চাষ করলে শ্রমের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও উৎপাদিত ফসলের অধিকার পৃথকভাবে হিসাব করতে হয়।
৪. বন্ধক রেখে টাকা ধার নেওয়া কি ইসলামে জায়েজ?
উত্তর: হ্যাঁ, ইসলামে স্বর্ণ, জমি, বাড়ি বা অন্য কোনো মূল্যবান সম্পদ বন্ধক রেখে টাকা ধার নেওয়া জায়েজ। তবে ঋণের সঙ্গে সুদ বা অন্য কোনো অবৈধ সুবিধার শর্ত থাকতে পারবে না। ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতার মধ্যে টাকার পরিমাণ, বন্ধকি সম্পদের বিবরণ এবং পরিশোধের সময়সীমা স্পষ্ট থাকা উচিত।
যেমন, কোনো ব্যক্তি জরুরি চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা ধার নিয়ে নিজের স্বর্ণালংকার বন্ধক রাখলেন। পরে ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করলে তিনি স্বর্ণালংকার ফেরত পাবেন। ঋণদাতা আগেই অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেওয়ার শর্ত করতে পারবেন না। ঋণগ্রহীতা নির্ধারিত সময়ে টাকা দিতে না পারলে তার সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করতে হবে। আর তিনি প্রকৃত অভাবগ্রস্ত হলে তাকে সময় দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
কুরআনের দলিল — সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৮২:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنْتُمْ بِدَيْنٍ إِلَىٰ أَجَلٍ مُسَمًّى فَاكْتُبُوهُ
বাংলা অর্থ: হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণের লেনদেন করবে, তখন তা লিখে রাখবে। (আয়াতের অংশ)
এখানে আল্লাহ ঋণের লেনদেন লিখে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে বিরোধ বা ভুল বোঝাবুঝি না হয়। বন্ধকের বৈধতার সরাসরি দলিল রয়েছে একই সূরার ২৮৩ নম্বর আয়াতে।
হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই একজন ইহুদির কাছে লোহার বর্ম বন্ধক রেখে বাকিতে খাদ্যশস্য ক্রয় করেছেন। — সহিহ বুখারি, হাদিস ২০৬৮।
আলোর দিশা ২৪ — আল-বাকারা ২৮২–২৮৩
৫. জমি বন্ধক রাখার বিনিময়ে পাওয়া টাকার ওপর কি যাকাত দিতে হবে?
উত্তর: শর্তসাপেক্ষে হ্যাঁ, বন্ধকের মাধ্যমে নেওয়া ঋণের টাকা যাকাতের হিসাবে আসতে পারে। তবে যাকাত ফরজ হবে কি না, তা নির্ভর করে ঋণ, নিজের অন্যান্য যাকাতযোগ্য সম্পদ, নিসাব এবং চান্দ্র বছরের হিসাবের ওপর। শুধু জমি বন্ধক রেখে টাকা গ্রহণ করলেই সেই টাকার ওপর আলাদাভাবে যাকাত ফরজ হয়ে যায় না।
ধরুন, একজন ব্যক্তি জমি বন্ধক রেখে দুই লাখ টাকা ঋণ নিলেন। সেই টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগ করলে ব্যবসার নগদ অর্থ, বিক্রয়যোগ্য পণ্য ও প্রাসঙ্গিক সম্পদের সঙ্গে ঋণের হিসাব করতে হবে। আবার পুরো টাকা খরচ হয়ে গেলে তা হাতে থাকা নগদ অর্থ হিসেবে গণনা করা যাবে না। ঋণের কতটুকু যাকাতের হিসাব থেকে বাদ দেওয়া যাবে, এ বিষয়ে মাজহাবভেদে মতপার্থক্য রয়েছে। তাই ব্যক্তির সম্পূর্ণ আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে যাকাত নির্ধারণ করতে হবে।
কুরআনের দলিল — সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৪৩:
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ
বাংলা অর্থ: তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করো, যাকাত প্রদান করো এবং রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো।
এই আয়াতে যাকাত প্রদানের নির্দেশ রয়েছে। তবে বন্ধকের মাধ্যমে নেওয়া ঋণের ওপর যাকাত গণনার বিস্তারিত নিয়ম এই আয়াতে নির্ধারণ করা হয়নি।
ফিকহি রেফারেন্স: International Islamic Fiqh Academy ঋণ ও পাওনা অর্থের যাকাত সম্পর্কে আলেমদের মতপার্থক্য ও প্রযোজ্য বিধান ব্যাখ্যা করেছে। এটি এই প্রশ্নের জন্য একটি প্রাসঙ্গিক ফিকহি উৎস; সরাসরি হাদিস নয়।
৬. রাসূলুল্লাহ ﷺ কি কখনো কোনো জিনিস বন্ধক রেখেছিলেন? এ সম্পর্কে সহিহ হাদিসে কী বলা হয়েছে?
উত্তর: হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ ﷺ একজন ইহুদির কাছে নিজের লোহার বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন। সহিহ বুখারিতে হজরত আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবী ﷺ একজন ইহুদির কাছ থেকে বাকিতে খাদ্যশস্য কিনে তার কাছে লোহার বর্ম বন্ধক রাখেন। অন্য বর্ণনায় হজরত আনাস (রা.) উল্লেখ করেছেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ পরিবারের জন্য যব সংগ্রহ করেছিলেন।
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, প্রয়োজনে বাকিতে পণ্য কেনা এবং ঋণ বা পাওনার নিরাপত্তায় সম্পদ বন্ধক রাখা বৈধ। একই সঙ্গে ইহুদি, হিন্দু, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে শরিয়তসম্মত ব্যবসায়িক লেনদেন করার অনুমতি রয়েছে। তবে লেনদেন অবশ্যই সুদ, প্রতারণা ও নিষিদ্ধ শর্তমুক্ত হতে হবে।
সহিহ হাদিসের মূল আরবি:
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اشْتَرَى طَعَامًا مِنْ يَهُودِيٍّ إِلَى أَجَلٍ، وَرَهَنَهُ دِرْعًا مِنْ حَدِيدٍ
বাংলা অর্থ: নবী ﷺ একজন ইহুদির কাছ থেকে বাকিতে খাদ্যশস্য ক্রয় করেছিলেন এবং তার কাছে নিজের লোহার বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন।
সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস ২০৬৮।
প্রাসঙ্গিক কুরআনের দলিল — সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৮৩:
فَرِهَٰنٌ مَّقْبُوضَةٌ
বাংলা অর্থ: তাহলে বন্ধকি বস্তু হস্তগত রাখা যেতে পারে। (আয়াতের অংশ)
কুরআনের এই নির্দেশ এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বাস্তব আমল থেকে বন্ধক রাখার বৈধতা প্রমাণিত হয়।

৭. ইসলামে একটি জিনিসের বিনিময়ে অন্য জিনিস আদান-প্রদান করা কি জায়েজ?
উত্তর: হ্যাঁ, ইসলামে একটি বৈধ পণ্যের বিনিময়ে অন্য বৈধ পণ্য আদান-প্রদান করা জায়েজ। এ ধরনের লেনদেনকে পণ্য বিনিময় বা বার্টার বলা হয়। যেমন, একজন কৃষক তাঁর উৎপাদিত ধানের বিনিময়ে কাপড় নিতে পারেন। আবার কেউ একটি গরুর বিনিময়ে অন্য বৈধ সম্পদ গ্রহণ করতে পারেন।
তবে পণ্যের মালিকানা, মূল্যমান, গুণগত অবস্থা এবং উভয় পক্ষের সম্মতি পরিষ্কার থাকতে হবে। প্রতারণা বা অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ গ্রহণ করা যাবে না। বিশেষ করে স্বর্ণ, রুপা, গম, যব, খেজুর ও লবণ বিনিময়ের ক্ষেত্রে হাদিসে সুদ এড়ানোর বিশেষ নিয়ম বর্ণিত হয়েছে। একই জাতীয় এসব দ্রব্য বিনিময়ে সমপরিমাণ এবং তাৎক্ষণিক হস্তান্তরের বিধান প্রযোজ্য; ভিন্ন জাতীয় নির্দিষ্ট দ্রব্য বিনিময়ের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক শর্ত মানতে হবে।
Sunnah
কুরআনের দলিল — সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৯:
إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ
বাংলা অর্থ: তবে তোমাদের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যে ব্যবসা হয়, তা বৈধ। (আয়াতের অংশ)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামে পারস্পরিক সম্মতিতে বৈধ ব্যবসা করার অনুমতি রয়েছে। তবে সম্মতি থাকলেই সুদযুক্ত বা অন্য কোনো নিষিদ্ধ লেনদেন বৈধ হয়ে যায় না।
সহিহ হাদিসের দলিল:
الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ وَالْفِضَّةُ بِالْفِضَّةِ وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ وَالْمِلْحُ بِالْمِلْحِ مِثْلًا بِمِثْلٍ سَوَاءً بِسَوَاءٍ يَدًا بِيَدٍ
বাংলা অর্থ: স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রুপার বিনিময়ে রুপা, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর এবং লবণের বিনিময়ে লবণ সমপরিমাণে ও হাতেহাতে বিনিময় করতে হবে।
সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৫৮৭ (গ)। হাদিসটির পরবর্তী অংশে এসব নির্দিষ্ট দ্রব্যের ভিন্ন জাতের মধ্যে বিনিময়ের বিধানও উল্লেখ রয়েছে।
মূল কথা
ইসলামে জমি বন্ধক রাখা, সুদমুক্ত ঋণ নেওয়া এবং বৈধভাবে পণ্য বিনিময় করা জায়েজ। তবে ঋণের বিনিময়ে বন্ধকি জমির ফসল বা অন্য কোনো অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করা সুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তাই প্রতিটি লেনদেনে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা মেনে চলা এবং সুদ ও অন্যায় থেকে বিরত থাকা জরুরি।
লেখক ও প্রকাশনা: আলোর দিশা ২৪ টিম
👨👩👧 পরিবার, বিবাহ ও সামাজিক জীবন: ইসলামের আলোকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
