বয়ান
কীভাবে গড়বেন একটি সুখী পরিবার | মিজানুর রহমান আজহারী

বিস্তারিত
একটি সুখী পরিবারের গল্প,
দাম্পত্য জীবন শুরু হয় বিবাহের মাধ্যমে; ইসলামে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ও পরকীয়া হারাম করা হয়েছে এবং বৈধ দাম্পত্য জীবনকে হালাল করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের পোশাক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, কারণ পোশাক যেমন মানুষের গোপনীয়তা রক্ষা করে, প্রশান্তি দেয় ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে, তেমনি স্বামী-স্ত্রীও একে অপরের চরিত্র রক্ষা, প্রশান্তি ও সৌন্দর্যের কারণ হয়। সুখী দাম্পত্য জীবন শুধু স্বামী বা স্ত্রীর একার প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে না; বরং উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, ত্যাগ ও সহযোগিতার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। সংসারকে সুখময় রাখতে ছোটখাটো বিষয়ে ছাড় দেওয়া, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করা, গুরুতর ঝগড়া এড়িয়ে চলা এবং অহেতুক সন্দেহ পরিহার করা জরুরি। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উচিত আল্লাহর আনুগত্যে একে অপরকে সহযোগিতা করা এবং একসঙ্গে ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত ও পারিবারিক সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তোলা। স্বামীর দায়িত্ব হলো স্ত্রীর সঙ্গে কোমল ও সুন্দর আচরণ করা, পারস্পরিক দাম্পত্য অধিকারে ইনসাফ করা, তার বৈধ ব্যক্তিগত কাজের স্বাধীনতা দেওয়া এবং তার ভালো কাজের প্রশংসা করা। এ ছাড়া স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ, পারিবারিক কাজে সহযোগিতা, বৈধ বিনোদনে অংশগ্রহণ, স্ত্রীর মতামত ও পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া, তাকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং তার জন্য দোয়া করাও স্বামীর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। দীর্ঘদিন স্ত্রীকে দেশে রেখে অপ্রয়োজনে প্রবাসে পড়ে না থেকে পারিবারিক সম্পর্ক ও দাম্পত্য অধিকারের প্রতিও যত্নশীল হতে হবে। অন্যদিকে, স্ত্রীর দায়িত্ব হলো স্বামীর জন্য প্রশান্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করা, তাকে ভালো কাজে উৎসাহিত করা এবং পারিবারিক জীবনে সহযোগিতা করা। স্বামীর প্রতি আনুগত্য, দাম্পত্য আহ্বানে সাড়া দেওয়া, সতীত্ব রক্ষা, স্বামীর সম্পদের যথাযথ হেফাজত এবং সন্তান ও পরিবারের সার্বিক দেখাশোনার ওপরও বক্তা গুরুত্ব দিয়েছেন। স্বামী অপছন্দ করেন এমন কাউকে তাঁর সম্মতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং সামর্থ্যবান হলে স্বামীকে স্বেচ্ছায় আর্থিক সহযোগিতা করার বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে। স্ত্রীর উচিত স্বামীর কাছে পরিপাটি থাকা, ভালোবাসা ও কোমল আচরণ প্রকাশ করা, অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে কথাবার্তায় শালীনতা বজায় রাখা এবং স্বামীর সামর্থ্যের অতিরিক্ত চাহিদা না করা। সবশেষে, বক্তার মূল বক্তব্য হলো, স্বামী-স্ত্রী উভয়েই নিজেদের দায়িত্ব পালন করলে, একে অপরকে সম্মান ও সহযোগিতা করলে এবং পারস্পরিক ভালোবাসা বজায় রাখলে পরিবারকে সুখী ও শান্তিময় করে তোলা সম্ভব।

সুখী সংসার গড়তে স্বামী-স্ত্রীর করণীয়…
সুখী দাম্পত্য জীবনের সাধারণ নীতি ৪টি পয়েন্ট,
১. ত্যাগ ও সমঝোতার মানসিকতা
দাম্পত্য জীবনে প্রত্যেকটি বিষয়ের হিসাব ধরে চলা যায় না। দুজনের কেউই সম্পূর্ণ নিখুঁত নন। তাই ছোটখাটো ভুলত্রুটি নিয়ে পড়ে না থেকে একে অপরকে বুঝতে হবে, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে হবে এবং প্রয়োজনে ছাড় দিতে হবে। কখনো ভালোবাসা, কখনো মতবিরোধ, কখনো হাসি-ঠাট্টা, আবার কখনো রাগ হতে পারে। তবে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দুজনেরই ত্যাগ করার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন।
২. গুরুতর ঝগড়া এড়িয়ে চলা
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ছোটখাটো মান-অভিমান হতে পারে। কিন্তু সামান্য বিষয় নিয়ে রাগ বাড়িয়ে গুরুতর ঝগড়ায় জড়ানো উচিত নয়। বক্তা সতর্ক করেছেন যে ছোট বিরোধ বড় হয়ে বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, শয়তান মুসলিম পরিবারের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে সংসার ভেঙে দিতে পারলে আনন্দিত হয়। তাই রাগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করা উভয়ের দায়িত্ব।
হাদিসের রেফারেন্স: সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৪৭৮২ — রাগ দমন সম্পর্কিত হাদিস।
৩. অহেতুক সন্দেহ পরিহার করা
স্বামী স্ত্রীর প্রতি কিংবা স্ত্রী স্বামীর প্রতি অকারণে সন্দেহ করলে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়। কে কাকে ফোন করছে, কার সঙ্গে কথা বলছে বা কী বার্তা এসেছে, তা নিয়ে অহেতুক অনুসন্ধান ও সন্দেহ সম্পর্ককে জটিল করে তুলতে পারে। বক্তার পরামর্শ হলো, সন্দেহের পরিবর্তে পারস্পরিক বিশ্বাস বজায় রাখতে হবে।
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২ — আলোর দিশা ২৪।
৪. আল্লাহর আনুগত্যে একে অপরের সহযোগী হওয়া
বক্তা স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসাকে একটি ত্রিভুজের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এর উপরের কোণে আল্লাহ এবং নিচের দুই কোণে স্বামী ও স্ত্রী। দুজন আল্লাহর আনুগত্যে যত এগিয়ে যাবেন, নিজেদের মধ্যেও তত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হবে। তাই মাঝে মাঝে একসঙ্গে নামাজ পড়া, কুরআন তিলাওয়াত করা, পরিবার নিয়ে ইবাদত করা এবং একসঙ্গে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আত-তাহরিম, আয়াত ৬ — আলোর দিশা ২৪।

স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ১০ টি পয়েন্ট
1. স্ত্রীর সঙ্গে সুন্দর ও কোমল আচরণ করা
বক্তার মতে, স্বামীর প্রথম দায়িত্ব হলো স্ত্রীর সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা, সম্মান দেখানো এবং কোমল আচরণ করা। তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি উদাহরণ তুলে ধরেছেন, যেখানে সফরের সময় নারীদের সঙ্গে কোমল আচরণ করতে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে বক্তা স্ত্রীদের কাচের পাত্রের সঙ্গে তুলনা করে বোঝান, তাঁদের সঙ্গে যত্নশীল ও সতর্ক আচরণ করা উচিত।
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৯ — আলোর দিশা ২৪।
হাদিসের রেফারেন্স: জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫ — পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণের গুরুত্ব।
2. দাম্পত্য ঘনিষ্ঠতায় পারস্পরিক অধিকারের প্রতি যত্নশীল হওয়া
বক্তা দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। একজন নিজের চাহিদা পূরণের কথা ভাববেন, অথচ অপরজনের অনুভূতি ও চাহিদা বিবেচনা করবেন না, এমন আচরণ ঠিক নয়। উভয়ের প্রতি যত্নশীল ও ন্যায়সংগত আচরণের মাধ্যমে দাম্পত্য সম্পর্ককে ভালোবাসাপূর্ণ রাখা উচিত।
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৭ — আলোর দিশা ২৪।
3. স্ত্রীর বৈধ ব্যক্তিগত কাজে স্বাধীনতা দেওয়া
বক্তা মনে করিয়ে দেন, বিবাহের পরেও স্বামী ও স্ত্রী দুজনই স্বতন্ত্র ব্যক্তি। স্ত্রী কোনো হালাল কাজ করতে চাইলে, বাবার বাড়িতে যেতে চাইলে কিংবা উপযুক্ত পরিবেশে নিজের কর্মজীবন গড়তে চাইলে স্বামীর উচিত বিষয়টি বিবেচনা করা। অবশ্যই বৈধতার পাশাপাশি নিরাপত্তা, শালীনতা ও পর্দার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। স্ত্রী নিজের পরিবার, অভ্যাস ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে স্বামীর সংসারে এসেছেন, এ বিষয়টিও স্বামীর বোঝা উচিত।
বক্তা এ প্রসঙ্গে নারীদের বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর স্ত্রীদের খেলাধুলা ও বৈধ কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়ার উদাহরণ দিয়েছেন।
4. স্ত্রীর ভালো কাজের প্রশংসা করা
স্ত্রীর রান্না, ঘর গোছানো, যত্ন বা অন্য কোনো ভালো কাজকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে প্রশংসা না করে থাকা উচিত নয়। বক্তা বলেছেন, আন্তরিক প্রশংসা স্ত্রীর মনে আনন্দ সৃষ্টি করে এবং ভালোবাসা বাড়ায়। তিনি রান্নার প্রশংসা নিয়ে একটি গল্পও বলেছেন, যেখানে স্বামী ভুলবশত অন্যের রান্নার প্রশংসা করায় সমস্যা তৈরি হয়। এর মাধ্যমে তিনি বোঝান, প্রশংসা হতে হবে আন্তরিক ও যথাযথ।
বক্তা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর স্ত্রীদের প্রশংসা করা এবং আদর করে সুন্দর নামে ডাকার উদাহরণও দিয়েছেন।
হাদিসের রেফারেন্স: জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫ — পরিবারের সঙ্গে উত্তম আচরণ।
5. স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা
শুধু মনে মনে ভালোবাসলেই হবে না, কথায় ও আচরণেও তা প্রকাশ করতে হবে। বক্তা বলেন, স্বামী স্ত্রীকে ভালোবাসার কথা বলতে পারেন, চিঠি লিখতে পারেন কিংবা ছোট একটি বার্তার মাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ যে নিজের স্ত্রীকে ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেছেন, সে উদাহরণও বক্তা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য হলো, ভালোবাসা প্রকাশ করতে সংকোচ করা উচিত নয়।
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আর-রূম, আয়াত ২১ — আলোর দিশা ২৪।
6. পারিবারিক কাজে সহযোগিতা করা
সংসারের সব কাজ স্ত্রীর একার দায়িত্ব নয়। স্বামীরও উচিত নিজের সামর্থ্য ও অবসর অনুযায়ী ঘরের কাজে অংশ নেওয়া। বক্তা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পারিবারিক কাজে সহযোগিতা করার উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তিনি শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, নিজেদের কাপড়চোপড় বা ছোটখাটো পারিবারিক কাজ নিজেরা করার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।
হাদিসের রেফারেন্স: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬৭৬ — রাসুলুল্লাহ ﷺ পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন।
7. স্ত্রীর সঙ্গে হালাল বিনোদনে অংশ নেওয়া
দাম্পত্য জীবনে বৈধ আনন্দ, খুনসুটি ও বিনোদনের সুযোগ রাখা উচিত। বক্তা রাসুলুল্লাহ ﷺ ও আয়েশা (রা.)-এর দৌড় প্রতিযোগিতার ঘটনা তুলে ধরেছেন। তিনি আরও বলেন, স্ত্রীকে আনন্দ দেওয়া বা তার সঙ্গে বৈধ খেলাধুলায় অংশ নেওয়া ইসলামের বাইরে কোনো বিষয় নয়। অযথা কঠোরতা না করে বৈধ আনন্দের সুযোগ গ্রহণ করা উচিত।
হাদিসের রেফারেন্স: সুনান আবু দাউদ, হাদিস ২৫৭৮ — আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দৌড় প্রতিযোগিতা।
8. স্ত্রীর মতামত ও পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া
বাড়ি, গাড়ি, বাজার কিংবা পারিবারিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শুধু নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। স্ত্রীর মতামত নেওয়া এবং পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। বক্তা হুদাইবিয়ার সন্ধির পর উম্মে সালামা (রা.)-এর পরামর্শের ঘটনা তুলে ধরেছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ সেই পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলেন। এ উদাহরণ দিয়ে বক্তা বোঝান, স্ত্রীর পরামর্শ উপকারী হতে পারে; তাই তা অবহেলা করা ঠিক নয়।
হাদিসের রেফারেন্স: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২৭৩১–২৭৩২ — হুদাইবিয়ার সন্ধির ঘটনা।
9. স্ত্রীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া ও দীর্ঘ বিচ্ছেদ এড়ানো
স্বামীকে স্ত্রী ও পরিবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে হবে। সামর্থ্য অনুযায়ী স্ত্রীকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাওয়া, একসঙ্গে সময় কাটানো এবং পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। বক্তা বিশেষভাবে প্রবাসীদের উদ্দেশে বলেন, স্ত্রীকে দেশে রেখে বছরের পর বছর দূরে থাকা এবং পারিবারিক দায়িত্ব অবহেলা করা ঠিক নয়।
তিনি উমর (রা.)-এর সময়ে সৈনিকদের পরিবার থেকে দূরে থাকার মেয়াদ নিয়ে একটি ঘটনা বর্ণনা করে ছয় মাসের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এই ছয় মাসকে সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য শরয়ি বিধান হিসেবে নিশ্চিত করতে আলাদা ফিকহি যাচাই দরকার।
10. স্ত্রীর জন্য দোয়া করা
বক্তার আলোচনায় স্বামীর শেষ দায়িত্ব হিসেবে স্ত্রীর জন্য দোয়া করার বিষয়টি এসেছে। শুধু পার্থিব সুখের জন্য নয়, এমন স্ত্রী ও সন্তান কামনা করতে হবে, যাদের দেখে হৃদয় প্রশান্ত হয়। তিনি পবিত্র কুরআনে বর্ণিত পরিবারের কল্যাণের দোয়াটি উল্লেখ করে পরিবারে শান্তি ও কল্যাণ কামনার ওপর গুরুত্ব দেন।
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪ — আলোর দিশা ২৪।

স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব ১০টি পয়েন্ট
1. স্বামীর জন্য প্রশান্তির পরিবেশ তৈরি করা
বক্তা বলেন, স্ত্রীর প্রথম দায়িত্ব হলো স্বামীর জন্য ঘরকে প্রশান্তির জায়গা করে তোলার চেষ্টা করা। স্বামী সারা দিন কাজ, ব্যবসা ও বাইরের নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। ঘরে ফিরে যেন তিনি আরও অশান্তির মুখে না পড়েন, বরং স্ত্রীর সান্নিধ্যে মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন, সে বিষয়ে যত্নবান হওয়া উচিত।
বক্তা খাদিজা (রা.)-এর উদাহরণ তুলে ধরেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন মক্কায় নির্যাতন ও দুশ্চিন্তার মুখোমুখি হতেন, তখন খাদিজা (রা.) তাঁকে সাহস ও মানসিক প্রশান্তি দিতেন। এভাবে পরিবারের মধ্যে স্বামীর জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরির গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে।
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আর-রূম, আয়াত ২১ — আলোর দিশা ২৪।
2. স্বামীকে সাহস জোগানো ও ভালো কাজে উৎসাহিত করা
স্বামী বিপদে পড়লে বা দুশ্চিন্তায় থাকলে স্ত্রী যেন তাঁকে আরও হতাশ না করেন। বরং তাঁর পাশে দাঁড়ান, সাহস জোগান এবং ভালো কাজে উৎসাহিত করেন। বক্তা ওহি নাজিলের শুরুতে রাসুলুল্লাহ ﷺ উদ্বিগ্ন হয়ে খাদিজা (রা.)-এর কাছে ফিরে আসার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। খাদিজা (রা.) তাঁকে আশ্বস্ত করেন এবং তাঁর ভালো গুণগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এই উদাহরণের মাধ্যমে বক্তা বোঝান, সংকটের সময় স্ত্রীর সমর্থন স্বামীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
3. স্বামীর প্রতি আনুগত্য ও দাম্পত্য আহ্বানে সাড়া দেওয়া
বক্তা স্ত্রীর দায়িত্ব হিসেবে স্বামীর প্রতি আনুগত্য এবং দাম্পত্য অধিকারের প্রতি যত্নশীল হওয়ার কথা বলেছেন। তিনি সহিহ বুখারির এমন একটি হাদিস উল্লেখ করেন, যেখানে স্বামীর আহ্বানে কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া সাড়া না দিলে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। একই সঙ্গে তিনি নফল রোজার ক্ষেত্রে স্বামীর অনুমতির প্রসঙ্গও আলোচনা করেন।
এখানে বক্তার আলোচনার মূল বিষয় হলো, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দাম্পত্য অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া এবং অহেতুক জেদ বা বিরোধের কারণে সম্পর্কের ক্ষতি না করা।
হাদিসের রেফারেন্স: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫১৯৩ — দাম্পত্য আহ্বানে অকারণে সাড়া না দেওয়ার বিষয়ে হাদিস।
নফল রোজার রেফারেন্স: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫১৯৫ — স্বামীর উপস্থিতিতে নফল রোজার অনুমতি সম্পর্কিত হাদিস।
4. সতীত্ব ও শালীনতা রক্ষা করা
বক্তা স্ত্রীর সতীত্ব ও লজ্জাস্থান হেফাজত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রমজানের রোজা, সতীত্ব রক্ষা এবং স্বামীর প্রতি দাম্পত্য দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেন। এসব আমলকে তিনি একজন নারীর নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আন-নূর, আয়াত ৩০–৩১ — আলোর দিশা ২৪।
5. স্বামীর সম্পদের যথাযথ হেফাজত করা
স্বামী উপার্জন করে পরিবারের জন্য যে অর্থ ও সম্পদ ব্যয় করেন, তা যথাযথভাবে ব্যবহার করা স্ত্রীর আলোচিত দায়িত্বগুলোর একটি। অপ্রয়োজনীয় অপচয় করা উচিত নয়। বক্তা হিন্দ বিনতে উতবার ঘটনার উল্লেখ করেন, যিনি স্বামী আবু সুফিয়ানের কৃপণতার বিষয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে অভিযোগ করেছিলেন। তাঁকে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রহণ করার অনুমতি দেওয়ার ঘটনাটি বক্তা উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেন।
হাদিসের রেফারেন্স: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৩৬৪ — হিন্দ (রা.) ও আবু সুফিয়ানের সম্পদসংক্রান্ত ঘটনা।
6. সন্তান ও পরিবারের সার্বিক দেখাশোনা করা
বক্তা স্ত্রীকে পরিবারের ব্যবস্থাপনার একজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সন্তানদের যত্ন নেওয়া, তাদের সময় দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা এবং ঘরের দৈনন্দিন দায়িত্ব সামলানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
বক্তা বিশেষভাবে সতর্ক করেন, সন্তানদের পুরোপুরি গৃহকর্মীর কাছে রেখে শুধু বাইরের কর্মজীবনে ব্যস্ত থাকলে মা-সন্তানের ঘনিষ্ঠতা ও সন্তানদের বেড়ে ওঠার পরিবেশে প্রভাব পড়তে পারে। তিনি সন্তানদের সময় দেওয়া এবং শিশুর পরিচর্যার বিষয়ে সচেতন থাকার কথা বলেছেন। যৌথ পরিবারে শ্বশুর-শাশুড়ি ও অন্যান্য আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিচক্ষণতার কথা উল্লেখ করেছেন।
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আত-তাহরিম, আয়াত ৬ — আলোর দিশা ২৪।
7 স্বামীর অপছন্দের কাউকে ঘরে প্রবেশ করানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা
বক্তা বলেন, স্বামী যাঁকে ঘরে প্রবেশ করানো অপছন্দ করেন, তাঁকে তাঁর সম্মতি ছাড়া ঘরে প্রবেশ করানোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এ বিষয়টি তিনি স্ত্রীর দায়িত্বের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং হাদিসে এ বিষয়ে সতর্কতা রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
হাদিসের রেফারেন্স: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫১৯৫ — স্বামীর অনুমতি ও ঘরে প্রবেশসংক্রান্ত আলোচনার প্রাসঙ্গিক রেফারেন্স। তবে এই নির্দিষ্ট হাদিসের লিংকটি বক্তব্যটির সব দিক সরাসরি প্রমাণ করে না; সুনির্দিষ্ট বিধানের জন্য সংশ্লিষ্ট হাদিসের পূর্ণ পাঠ যাচাই করা উচিত।
8. সামর্থ্যবান হলে স্বামীকে আর্থিক সহযোগিতা করা
বক্তা স্পষ্ট করেন যে পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব স্বামীর ওপর বর্তায় বলে তিনি যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে স্ত্রীর আর্থিক সহযোগিতাকে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তবে স্ত্রী সম্পদশালী হলে এবং স্বামী আর্থিক সমস্যায় থাকলে স্বেচ্ছায় তাঁকে সহযোগিতা করা ভালো। এ প্রসঙ্গে খাদিজা (রা.)-এর সম্পদ দিয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দাওয়াতি কাজে সহযোগিতা করার উদাহরণ তিনি উল্লেখ করেছেন।
9. স্বামীর সামনে পরিপাটি থাকা ও কোমল আচরণ করা
বক্তা বলেন, স্ত্রীর উচিত স্বামীর কাছে পরিপাটি থাকা, নিজের পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জার যত্ন নেওয়া এবং ভালোবাসাপূর্ণ আচরণ করা। তিনি মনে করেন, স্বামীর জন্য সুন্দরভাবে সাজা ও নিজেকে উপস্থাপন করা দাম্পত্য ভালোবাসা প্রকাশের একটি উপায়।
এ ছাড়া বক্তা বাইরের পরিবেশে শালীন পোশাক, পর্দা এবং অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে কথাবার্তায় সংযম বজায় রাখার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে ঘরে স্বামীর সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলার পাশাপাশি বাইরে প্রয়োজনীয় কথাবার্তায় শালীনতা বজায় রাখার বিষয়টিও এসেছে।
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১ — আলোর দিশা ২৪।
10. স্বামীর সামর্থ্যের অতিরিক্ত দাবি না করা
স্ত্রীর চাহিদা ও আবদার থাকা স্বাভাবিক। তবে সেগুলো প্রকাশ করার সময় স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা করা উচিত। বক্তা বলেন, স্বামীকে তাঁর সামর্থ্যের বাইরে ব্যয় করতে চাপ দেওয়া, দামি জিনিসের জন্য জেদ করা কিংবা শর্ত দিয়ে সম্পর্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করা দাম্পত্য জীবনের ক্ষতি করতে পারে।
তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর স্ত্রীদের পার্থিব ভোগবিলাসের চাহিদা এবং এ বিষয়ে নাজিল হওয়া কুরআনের আয়াতের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্য হলো, পারিবারিক ভালোবাসা ও সম্পর্ককে অক্ষুণ্ণ রেখে চাহিদা প্রকাশ করতে হবে।
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আল-আহযাব, আয়াত ২৮–২৯ — আলোর দিশা ২৪।

মিজানুর রহমান আজহারীর এই আলোচনা থেকে আমাদের শিক্ষা,
সুখী দাম্পত্য জীবন গড়তে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই ভালোবাসা, ত্যাগ, সম্মান ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে চলতে হবে।
ছোটখাটো ভুলত্রুটি ক্ষমা করা, অহেতুক সন্দেহ ও ঝগড়া এড়িয়ে চলা এবং একে অপরের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের দায়িত্ব পালন করলে, বিপদে পাশে দাঁড়ালে এবং আল্লাহর আনুগত্যে একে অপরকে সহযোগিতা করলে সংসারে শান্তি ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
মনে রাখতে হবে, সুখী সংসার গড়ার দায়িত্ব একজনের নয়; বরং দুজনের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই দাম্পত্য জীবনকে সুন্দর করে তোলে।

মূল কথা,
“সংসার ভাঙতে বড় কোনো ঝড়ের প্রয়োজন হয় না; কখনো একটু অবহেলা, একটু অহংকার আর একটুখানি অসম্মানই যথেষ্ট। মনে রাখবেন, পৃথিবীর সবাই আপনাকে ছেড়ে গেলেও পরিবারের মানুষগুলো যেন আপনার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত না হয় কারণ দিন শেষে শান্তির ঠিকানা কোনো প্রাসাদ নয়, শান্তির ঠিকানা হলো নিজের পরিবার।”
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার, কুরআন গবেষক ও আলেম মিজানুর রহমান আজহারীর আলোচনার মূল বক্তব্য অনুসরণ করে সংকলন ও সম্পাদনা করা হয়েছে এবং আলোর দিশা ২৪-এ প্রকাশিত হয়েছে।
প্রকাশনার ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত কোনো তথ্যগত, ভাষাগত বা রেফারেন্সসংক্রান্ত ভুলত্রুটি থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল।
সম্মানিত পাঠকদের কাছে কোনো ভুল পরিলক্ষিত হলে অনুগ্রহ করে আমাদের জানাবেন। আমরা যথাযথ যাচাইয়ের মাধ্যমে তা সংশোধন করতে আন্তরিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আলোচনা: মিজানুর রহমান আজহারী
লেখক ও প্রকাশনা: আলোর দিশা ২৪ টিম.
