Play Tube ভিডিও
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর লোহার বর্ম বন্ধক রাখার ঘটনা: সহিহ বুখারিতে কী বলা হয়েছে?
রাসূলুল্লাহর বর্ম বন্ধক রাখার ঘটনা
রাসূলুল্লাহর বর্ম বন্ধক রাখার ঘটনা ইসলামের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনায় একজন ইহুদির কাছ থেকে বাকিতে খাদ্যশস্য ক্রয় করেছিলেন এবং মূল্য পরিশোধের নিশ্চয়তা হিসেবে নিজের লোহার বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত এই ঘটনা ইসলামে ঋণ, বন্ধক এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়িক লেনদেনের সুস্পষ্ট প্রমাণ।
ইসলাম মানুষের ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ব্যবসায়িক জীবনের জন্যও সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে। ঋণ গ্রহণ,
একজন ইহুদির কাছ থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর খাদ্যশস্য ক্রয়
মদিনায় বসবাসকালে রাসূলুল্লাহ ﷺ একবার একজন ইহুদির কাছ থেকে বাকিতে খাদ্যশস্য ক্রয় করেছিলেন। নির্ধারিত সময়ে মূল্য পরিশোধের শর্তে তিনি খাদ্যশস্য গ্রহণ করেন এবং পাওনার নিশ্চয়তা হিসেবে নিজের লোহার বর্মটি বন্ধক রাখেন।
উম্মুল মুমিনিন আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন
আরবি হাদিস:
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اشْتَرَى طَعَامًا مِنْ يَهُودِيٍّ إِلَى أَجَلٍ، وَرَهَنَهُ دِرْعًا مِنْ حَدِيدٍ
বাংলা অর্থ: নবী ﷺ একজন ইহুদির কাছ থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদে বাকিতে খাদ্যশস্য ক্রয় করেছিলেন এবং তার কাছে একটি লোহার বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন।
হাদিসের রেফারেন্স: সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৬৮, কিতাবুল বুয়ু (ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায়)।
এখানে উল্লেখিত বর্ম ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে শরীরের সুরক্ষার জন্য ব্যবহৃত লোহার তৈরি বিশেষ পোশাক। রাসূলুল্লাহ ﷺ সেই মূল্যবান সামরিক সরঞ্জামটি পাওনাদারের কাছে জামানত হিসেবে রেখেছিলেন।
এই লেনদেনের বিশেষ দিক হলো, ক্রেতা ছিলেন আল্লাহর রাসূল ﷺ এবং বিক্রেতা ছিলেন একজন ইহুদি। ধর্মীয় পরিচয়ের পার্থক্য তাঁদের বৈধ ব্যবসায়িক সম্পর্কের অন্তরায় হয়নি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ কতটুকু যবের বিনিময়ে বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন?
সহিহ বুখারির অন্য একটি বর্ণনায় এই লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখ রয়েছে।
আয়িশা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁর লোহার বর্মটি একজন ইহুদির কাছে ত্রিশ সা’ যবের বিনিময়ে বন্ধক রাখা ছিল।
হাদিসের রেফারেন্স: সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯১৬, কিতাবুল জিহাদ ওয়াস সিয়ার।
এ বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর সেই বর্ম বন্ধক ছিল। এখানে ‘সা’ হলো তৎকালীন আরবে ব্যবহৃত খাদ্যশস্য পরিমাপের একটি একক।
আনাস (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর পরিবারের খাদ্যের প্রয়োজনে মদিনার একজন ইহুদির কাছে বর্ম বন্ধক রেখে যব গ্রহণ করেছিলেন।
হাদিসের রেফারেন্স: সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৬৯।
এই বর্ণনাগুলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাধারণ জীবনযাপন এবং তাঁর পরিবারের বাস্তব অর্থনৈতিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে।
পবিত্র কুরআনে সম্পদ বন্ধক রাখার বিধান
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই লেনদেন কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; সম্পদ বন্ধক রাখার বিধান পবিত্র কুরআনেও উল্লেখ রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
আরবি আয়াতের প্রাসঙ্গিক অংশ:
وَإِن كُنتُمْ عَلَىٰ سَفَرٍ وَلَمْ تَجِدُوا كَاتِبًا فَرِهَٰنٌ مَّقْبُوضَةٌ
বাংলা অর্থ: “আর তোমরা যদি প্রবাসে থাক এবং কোন লেখক না পাও তবে বন্ধকী বন্তু হস্তগত রাখা উচিত।”
কুরআনের রেফারেন্স: সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮৩। সূত্র: আলোর দিশা ২৪ — সূরা আল-বাকারাহ।
আয়াতটিতে সফর অবস্থায় ঋণসংক্রান্ত লেনদেনের নিরাপত্তার জন্য বন্ধকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনায় অবস্থানকালে নিজের বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন। ফলে তাঁর আমল থেকে বোঝা যায়, বন্ধকের বৈধতা কেবল সফর অবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ব্যবসায়িক সম্পর্ক
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সময় মদিনায় মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষও বসবাস করতেন। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক ও অর্থনৈতিক লেনদেন প্রচলিত ছিল।
রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও একজন ইহুদির সঙ্গে বাকিতে খাদ্যশস্য ক্রয় ও বন্ধকের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক চুক্তিতে অংশ নিয়েছিলেন।
এখানে লক্ষণীয়, রাসূলুল্লাহ ﷺ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ব্যবসায়ীর সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়কে বাধা হিসেবে গ্রহণ করেননি। বরং প্রচলিত বৈধ ব্যবসায়িক পদ্ধতি অনুসরণ করে পণ্য ক্রয় করেছেন এবং পাওনাদারের অধিকার নিশ্চিত করতে নিজের সম্পদ বন্ধক রেখেছেন।
এ ঘটনা ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবধর্মী চরিত্রকে স্পষ্ট করে। ইসলামী শরিয়ত মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, প্রয়োজনীয় কেনাকাটা এবং বৈধ আর্থিক সম্পর্ককে অস্বীকার করে না; বরং সেগুলোকে ন্যায়সংগত ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার বিধান দেয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এই ঘটনায় ধর্মীয় সহাবস্থান, পারস্পরিক আস্থা, আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং শরিয়তসম্মত ব্যবসায়িক ব্যবস্থার একটি বাস্তব উদাহরণ প্রতিফলিত হয়েছে।
এই ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা
ইসলামে প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ, বাকিতে পণ্য ক্রয় এবং সম্পদ বন্ধক রাখার বৈধ সুযোগ রয়েছে।
ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতা ন্যায়সংগত ব্যবসা ও পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের অন্তরায় নয়।
আর্থিক লেনদেনে সততা, স্বচ্ছতা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং পাওনাদারের অধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন আমাদের শেখায়, মর্যাদা ও সম্মান থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মতো অর্থনৈতিক প্রয়োজনের মুখোমুখি হওয়া অসম্মানের নয়।
ইসলামী শরিয়তের বিধান মানুষের বাস্তব প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে।
এই ঘটনা প্রমাণ করে, ইসলামের অর্থনৈতিক নীতিমালায় মানবিকতা, দায়িত্বশীলতা ও সামাজিক সহাবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে।
সমাজে প্রচলিত ধারণা
সমাজে অনেকের ধারণা, ঋণ গ্রহণ বা কোনো সম্পদ বন্ধক রাখা আর্থিক দুর্বলতা কিংবা অসম্মানের বিষয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করা ইসলামসম্মত নয়। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই একজন ইহুদির কাছ থেকে বাকিতে খাদ্যশস্য কিনে নিজের লোহার বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন। সহিহ হাদিসে বর্ণিত এই ঘটনা প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দূর করার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
ইসলামে জমি বন্ধক, ঋণ ও লেনদেন সম্পর্কে ৭টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
১. ইসলামে জমি বন্ধক রাখা বা নেওয়া কি জায়েজ?
📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
২. জমি বন্ধক নেওয়া কি সুদের অন্তর্ভুক্ত? ইসলাম কী বলে?
📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
৩. জমি বন্ধক রেখে টাকা নিলে সেই জমির ফসল ভোগ করার অধিকার কার?
📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
৪. বন্ধক রেখে টাকা ধার নেওয়া কি ইসলামে জায়েজ?
📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ভিডিও দেখুন
৫. জমি বন্ধক রাখার বিনিময়ে পাওয়া টাকার ওপর কি যাকাত দিতে হবে?
📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
৬. রাসূলুল্লাহ ﷺ কি কখনো কোনো জিনিস বন্ধক রেখেছিলেন? এ সম্পর্কে সহিহ হাদিসে কী বলা হয়েছে?
📖 বিস্তারিত দেখুন | ▶️ ভিডিও দেখুন
৭. ইসলামে একটি জিনিসের বিনিময়ে অন্য জিনিস আদান-প্রদান করা কি জায়েজ?
আলোচনায়: ড. মিজানুর রহমান আজহারী
লেখক ও প্রকাশনা: আলোর দিশা ২৪ টিম
মূসা (আ.) মহান আল্লাহকে দেখার বিস্ময়কর ঘটনা || মিজানুর রহমান আজহারী
